
বাংলাদেশে বর্তমানে কর্মসংস্থানের সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মার্চ ২০২৬-এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশে বেকারত্বের হারের পাশাপাশি আংশিক বেকারত্ব এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের মধ্যে এই সমস্যা প্রকট। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং স্বকর্মসংস্থানের দিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সামঞ্জস্য বেশ দুর্বল। এ অবস্থায় দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রমশক্তির জন্য পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। কুমিল্লার শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের ভিত্তিও পুরোনো।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি মন্থর এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শ্লথ। এই পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারে আসা বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও উন্নয়ন করিডরগুলোতে কাজের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা বর্তমান চাকরির বাজারে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। ফলে ঢাকার বাইরে শিল্পের যে বলয় তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশ এই এলাকাগুলোকে ঘিরে।
শিল্পভিত্তিক চাকরির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চল একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে মিরসরাইয়ের নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এই যাত্রায় গতি যোগ করেছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্বিতীয় অংশে রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এখানে ১৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে জায়গা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে একটি উৎপাদনে গেছে, তিনটি প্রস্তুতির পর্যায়ে এবং ১৪টি নির্মাণাধীন রয়েছে। বেপজার আওতাধীন অঞ্চলগুলোতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট ২৫ হাজার ১৬৪টি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং জুন ২০২৬ শেষে এসব অঞ্চলে মোট কর্মসংস্থান দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে মিরসরাইয়ের পাশাপাশি কুমিল্লা ইপিজেডও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় ২৬৭ একরের এই ইপিজেডে তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়াজাত পণ্য, খেলনা, জুতা, ইলেকট্রনিকস ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো শিল্প রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪৯ হাজার ২২৩ জন কাজ করছেন। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডর দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৫৬ শতাংশ ধারণ করে, যেখানে গাজীপুর থেকে শুরু করে নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় কাজের ঘনত্ব বেশি। চলতি বছর সেখানে এলইডি, জুতা, তাঁবু ও ক্যাম্পিং পণ্য, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে। এসব শিল্পে শ্রমিকের পাশাপাশি মেশিন অপারেশন, কারিগরি কাজ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রকৌশল, গুদাম, সরবরাহ, প্রশাসন ও বিক্রয় বিভাগের কাজ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। সেখানে পোশাকের পাশাপাশি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও বৈদ্যুতিক পণ্য এবং গাড়ির আসনের কভারসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়।
নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অঞ্চল দীর্ঘকাল ধরেই দেশের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিল্পকারখানার একটি বড় অংশ ঢাকা থেকে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও আড়াইহাজারের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে প্রায় ৭৬ হাজার ১৪২ জন কর্মরত আছেন। তবে এই অঞ্চলের শিল্পগুলো গ্যাস-সংকটসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে, যা কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতাকে মাঝে মাঝে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়।
বর্তমানে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার অনুমোদিত পদ শূন্য রয়েছে। সরকার এই শূন্য পদগুলো যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ৫ লাখ ২০ হাজার পদ মানেই নতুন নিয়োগ নয়, কারণ নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অনুমোদনের পর বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের মতো বেশ কিছু দীর্ঘ ধাপ পেরিয়ে সম্পন্ন হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কার্যালয়গুলো থেকেই এই বড় অংশের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শেষ তারিখ: ২০ অক্টোবর। 500, 20. সৌদির কিং আবদুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নে পিএইচডি, জেনে নিন তথ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক শহরগুলোতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ২০১৩ সালে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ লাখ, যা ২০২৪ সালে ১ কোটি ১৮ লাখে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষের সম্পৃক্ততা ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশ হয়েছে। রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, যশোর, রংপুর ও সিলেটের মতো শহরগুলোতে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের প্রসার কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য ও অটোমোবাইল শিল্প বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বাজারে বড় ভূমিকা রাখবে। তাই চাকরির অনুসন্ধানে এখন শুধু রাজধানীর দিকে না তাকিয়ে অর্থনৈতিক করিডর এবং উদীয়মান আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রগুলোতে নজর দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০