চলচ্চিত্র ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে খোলামেলা ঋত্বিক ঘটক

প্রকাশ:
Print news

আমার জন্মের সময়টা ছিল বেশ অস্থির ও বিভ্রান্তিকর। শৈশব ও কৈশোরে আমি অবিভক্ত বাংলাকে প্রত্যক্ষ করেছি। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার জয়জয়কার। অন্যদিকে কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের নতুন ধারার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তখন দেশপ্রেমের উদ্দীপনা আর গ্রামবাংলায় মিথ ও লোকগাথা নিয়ে নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা। তবে সেই স্বপ্নের দিনগুলো খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সংঘাত দেশটিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। পরিণতিতে আমরা পাই খণ্ডিত স্বাধীনতা ও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। গঙ্গা ও পদ্মার জল তখন মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। আমরা সেই স্বপ্নভঙ্গের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম। স্বাধীনতার পর অবশিষ্ট থাকল এক জীর্ণ, মৃতপ্রায় বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য ও কালোবাজারির আধিপত্য। তৎকালীন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকেরা সমাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল, মানুষের ভাগ্য নেমে এসেছিল ঘোর দুঃস্বপ্নের অতলে।

আমার প্রতিটি চলচ্চিত্রে আমি এই কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, বাঙালিকে তার অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন করা একজন শিল্পী হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা। আমি সব সময় নিজের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা করেছি, আমার কাজের চূড়ান্ত বিচার করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। মেঘে ঢাকা তারা ও কোমল গান্ধার নির্মাণের অভিজ্ঞতা আমার ভেতরে এক ধরনের গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। এর পরেই আমি সুবর্ণরেখা নির্মাণের কাজ হাতে নিই। বাইরে থেকে হয়তো মনে হতে পারে, আমি আমার ভাবনা অনায়াসেই পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিটি ধাপ শেষে আমি চরম মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তিতে ভুগতাম।

বর্তমানে বাংলায় বিশ্লেষণধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। চলচ্চিত্রের ভেতরের পরিস্থিতি বা দর্শন যারা নিজেরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, তাদের বোঝানো দুরূহ। নির্মাণের ব্যয়ভার এখন অনেক বেড়েছে। তিন থেকে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করার পর কোনো প্রযোজক যদি তার লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত না পান, তবে স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষামূলক বা শিল্পধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণে তার আগ্রহ কমে যাবে। এত সব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি সুবর্ণরেখা নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়েছি।

শুটিংয়ের সময় একটি ঘটনা আমার আজও মনে পড়ে। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে আমরা তাঁবুর ব্যবস্থা করেছিলাম। শুটিং চলাকালে হঠাৎ দেখি, ছোট মেয়ে মাঠের দিক থেকে প্রচণ্ড আতঙ্ক নিয়ে দৌড়ে আসছে। একটি বহুরূপী কালী সেজে তাকে তাড়া করছিল। সেই মুহূর্তে ছবির সীতা চরিত্রটির কথা আমার মনে পড়ে যায়, যে মহাকালীর সামনে দাঁড়িয়ে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করেছিল। বাস্তব জীবনের ওই ঘটনার সাথে ছবির দৃশ্যটি মিলে গিয়েছিল। আধুনিক জীবনের শূন্যতা ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতি বোঝাতে আমি মহাকালীর পুরাণকাহিনিকে আমার বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। কোমল গান্ধার চলচ্চিত্রেও বিয়ের সংগীত বা উমার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার দৃশ্যে আমি বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেয়েছি। আমার লক্ষ্য ছিল অবিভক্ত বাংলার স্বপ্নকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরা।

চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটে রেললাইনকে আমি বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হিসেবে দেখি। পূর্ববঙ্গের দিকে যাওয়ার পথ যেন এখন শুধুই স্মৃতি। সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্রে বিমানঘাঁটির ধ্বংসস্তূপের মাঝে এক বালক ও বালিকার দিশাহীন ঘুরে বেড়ানো তাদের বিপর্যস্ত ভবিষ্যৎকেই নির্দেশ করে। তাদের নিষ্পাপতা ও অজ্ঞতা সত্যিই ভয়াবহ। সুবর্ণরেখা কোনো নিখুঁত চলচ্চিত্র নয়, কারণ এর মূল গল্পে প্রচুর মেলোড্রামা ছিল। দুটি অধ্যায়ের নানা ঘটনা ও পর্বকে একসূত্রে গেঁথে গল্পটি তৈরি করতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গোরা বা নৌকাডুবির মতো উপন্যাসে আমরা যেমন জীবন দর্শন ও ঘটনার সমাপতন দেখি, আমি আমার কাজেও সেই ধারা অনুসরণ করতে চেয়েছি।

বাস্তবতার দায় থেকে সীতা, হরপ্রসাদ কিংবা ঈশ্বরের চরিত্রগুলোকে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদি তা সঠিকভাবে হতো, তবে পতিতালয়ে সীতাকে খুঁজে পাওয়ার মতো ঘটনাগুলো অবিশ্বাস্য মনে হতো না। আমরা যারা বিভক্ত বাংলার বাসিন্দা, সেই সহিংসতার দীর্ঘ রাত পেরিয়ে এখনো অস্পষ্ট দৃষ্টি নিয়ে বেঁচে আছি। কোমল গান্ধার-কে আমি আমার সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চলচ্চিত্র বলে মনে করি, যদিও দর্শকরা শুরুতে সেভাবে সাড়া দেয়নি। হয়তো বিশ-পঁচিশ বছর পর মানুষ এই ছবির মর্মার্থ বুঝতে পারবে। শিল্পী হিসেবে আমি উপলব্ধি করেছি, চরম বাধা-বিপত্তির মুখেও নিজের বিবেচনাবোধ বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সংকটের কাছে আত্মসমর্পণ না করে শিল্পীর লড়াই চালিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য।

শেয়ার করুন
শিরোনাম :
মোংলা বন্দরে ৪ হাজার ৬৮ কোটির উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী মামলায় হাজিরা না দেওয়ায় চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প-যুগের কার্যকর অবসান চলচ্চিত্র ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে খোলামেলা ঋত্বিক ঘটক শচীনকে টপকে ওয়ানডেতে রান তাড়ায় নতুন রেকর্ড কোহলির টেকনাফে ইয়াবা সংক্রান্ত বিরোধে দুইজনের মৃত্যু, আহত দুই বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মৃত্যুর ঘটনা মামলায় দিশার ফের তিনদিনের রিমান্ড মাহিন খান: কারও সঙ্গে যুদ্ধ নয়, নিজেদের ঐতিহ্য নিয়েই এগোতে হবে ইয়ামাল ও রাফিনিয়ার গোলে অ্যাস্টন ভিলাকে হারাল বার্সেলোনা ট্রাম্প যুগের অবসান: মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মোড় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস উদ্বোধন করতে খুলনায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে ইতিহাসের প্রথম আফ্রো-লাতিনা মুসলিম কংগ্রেস সদস্য শেভালিয়ের ডিসেম্বরের মধ্যেই পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ ৩১ হাজার ৯৯৯ টাকায় শাওমির নতুন শক্তিশালী রেডমি ১৭ ফাইভ-জি ফোন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, চাপে ট্রাম্প স্বদলীয় এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নওগাঁয় বিএনপি নেতার হুঁশিয়ারি ৫২তম বিসিএস কি বিশেষ হবে? চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে সংশয় ও কৌতূহল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেল ডেমোক্র্যাটরা করাচি টেস্টে শেন ওয়ার্নকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেন সেলিম মালিক ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের মোংলা বন্দরে ৪ হাজার ৬৮ কোটির উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী মামলায় হাজিরা না দেওয়ায় চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প-যুগের কার্যকর অবসান চলচ্চিত্র ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে খোলামেলা ঋত্বিক ঘটক শচীনকে টপকে ওয়ানডেতে রান তাড়ায় নতুন রেকর্ড কোহলির টেকনাফে ইয়াবা সংক্রান্ত বিরোধে দুইজনের মৃত্যু, আহত দুই বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মৃত্যুর ঘটনা মামলায় দিশার ফের তিনদিনের রিমান্ড মাহিন খান: কারও সঙ্গে যুদ্ধ নয়, নিজেদের ঐতিহ্য নিয়েই এগোতে হবে ইয়ামাল ও রাফিনিয়ার গোলে অ্যাস্টন ভিলাকে হারাল বার্সেলোনা ট্রাম্প যুগের অবসান: মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মোড় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস উদ্বোধন করতে খুলনায় যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে ইতিহাসের প্রথম আফ্রো-লাতিনা মুসলিম কংগ্রেস সদস্য শেভালিয়ের ডিসেম্বরের মধ্যেই পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ ৩১ হাজার ৯৯৯ টাকায় শাওমির নতুন শক্তিশালী রেডমি ১৭ ফাইভ-জি ফোন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, চাপে ট্রাম্প স্বদলীয় এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নওগাঁয় বিএনপি নেতার হুঁশিয়ারি ৫২তম বিসিএস কি বিশেষ হবে? চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে সংশয় ও কৌতূহল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেল ডেমোক্র্যাটরা করাচি টেস্টে শেন ওয়ার্নকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেন সেলিম মালিক ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের