ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সংকটে পড়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার অংশ নেন, যেখানে ভোট প্রদানের হার ছিল ৭৭ শতাংশেরও বেশি—যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে বুথফেরত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারছে না।
নির্বাচন পরবর্তী ইসরায়েলের ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর চ্যানেলের বুথফেরত জরিপ থেকে জানা গেছে, নেতানিয়াহুর জোট প্রাথমিকভাবে ৫০টি আসন পাওয়ার ইঙ্গিত পায়। অন্যদিকে বিরোধী জোটের দখলে যেতে পারে ৫২টি আসন। যদিও বুধবার ভোরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী নেতানিয়াহুর অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়ে ৫২টিতে এবং বিরোধীদের আসন কমে ৪৯টিতে দাঁড়িয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে এককভাবে সরকার গড়তে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, তা এখনো কোনো শিবিরের পক্ষেই নেই। ফলে দেশটিতে পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চ্যানেল ১২-এর সর্বশেষ জরিপে তার জোটের সম্ভাব্য আসন বেড়ে ৫২টি হয়েছে। জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং নেতানিয়াহুর সরকার পরিবর্তনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বুথফেরত জরিপে দলটি ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেয়ে পার্লামেন্টে একক বৃহত্তম দল হতে পারে, যা তাদের বর্তমান ৩২টি আসনের তুলনায় বেশ কম। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২১ থেকে ২৩টি এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা বি’ইয়াচাদ দল ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে। এছাড়া জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস ৯ থেকে ১০টি এবং ওতজমা ইয়েহুদিত ৬ থেকে ৭টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দলটির আসনসংখ্যা ৩২।
তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখা নেতানিয়াহুর জন্য এবার বড় চ্যালেঞ্জ। যদি কোনো পক্ষই সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটি আবারো নির্বাচনের দিকে গড়াতে পারে, যেমনটা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যকার অস্থির রাজনৈতিক সময়ে ঘটেছিল। সেক্ষেত্রে নতুন সরকার না আসা পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যেও ইসরায়েল দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পড়েছিল।
আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে সরকার গঠনের সমীকরণ।
জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল দুটি সম্মিলিতভাবে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে, যা তাদের জন্য নজিরবিহীন সাফল্য। রা’আম নেতা মানসুর আব্বাস চ্যানেল ১২-কে জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবির—উভয় পক্ষই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে আরব দলের সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন করা আইজেনকটের মতো নেতাদের জন্য কঠিন হতে পারে, কারণ ইয়িসরাইল বেইতেনু বা বি’ইয়াচাদ দলের মতো জোটসঙ্গীরা আরব-প্রধান দলগুলোর সাথে জোট না করার অঙ্গীকার করেছে। চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, শুধু পরিবর্তনপন্থী শিবির নয়, নেতানিয়াহুর সমর্থক শিবির থেকেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
বিরোধীদের নেতা গাদি আইজেনকট এই ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় জানান, এটি মূলত ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থার প্রতিফলন। চূড়ান্ত ফলাফল ইতিবাচক হলে তা দায়িত্বশীল জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয় হবে বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটস নেতা ইয়ার গোলান পরিবর্তনের লক্ষ্যে সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যিনি প্রচারণার সময় রা’আমের সঙ্গে জোট গড়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের ওপর এখন দায়িত্ব বর্তাবে সরকার গঠনের জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত রাজনৈতিক সমীকরণ অস্পষ্টই থাকছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে সমর্থকদের ধৈর্যের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর নেতারা তাদের এই নির্বাচনী সাফল্যের পর নেতানিয়াহু এবং তার কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের ক্ষমতা থেকে বিদায় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বুথফেরত জরিপ এবং চূড়ান্ত ফলাফলে পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা থাকায় দেশটির সরকার গঠনের ভবিষ্যৎ এখনো ঝুলে আছে চরম অনিশ্চয়তায়। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনই প্রেসিডেন্টের কাছে সরকার গঠনের সুযোগ চাইতে পারেন।






