জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশ মাছের গতিপথ বদলে গেছে। নদী ও সাগরে দূষণ, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় নদ-নদীতে এখন আর আগের মতো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জেলেরা গভীর বঙ্গোপসাগরের দিকে ছুটছেন, যেখানে বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ের কবলে পড়ে প্রতি বছর অসংখ্য জেলেকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কয়েক যুগ ধরে ইলিশ মাছ গতিপথ পরিবর্তন করছে। কিন্তু এখন এ সব নদী, নদীর মোহনা কিংবা সাগর মোহনাতেও ইলিশ ধরা পড়ছে না।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসেই দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে চারটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ দুটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় একজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচজন। সংগঠনটির নথি বলছে, গত ৩৩ বছরে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ১৯২ জনের বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের সন্ধান আর মেলেনি। একই সময়ে ভেসে আসা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত সাড়ে চার শতাধিক জেলের মরদেহ। তবে এই এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ায় ট্রলার ডুবি বেশি ঘটে। এছাড়া ভাসমান অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চারশত জেলের। একই ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ মো. বিল্লাল, মো. কাওসার, মো. নুর আলম ও মো. ইব্রাহিম।
পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনের হিসাবমতে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে সর্বোচ্চ ৯১ জন জেলে সাগরে হারিয়ে যান। এছাড়া ১৯৯৩ সালে পাঁচজন, ১৯৯৪ সালে দুইজন, ২০০১ সালে পাঁচজন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০১৪ সালে সাতজন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে। তবে ট্রলার মালিক সমিতির মতে, এই সরকারি হিসাবের তুলনায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে ১৩ জন জেলে নিয়ে তালতলী উপজেলার আল-আমীন ও গোলাম রাব্বির যৌথ মালিকানাধীন একটি ট্রলার সাগরে গিয়েছিল। ২১ সেপ্টেম্বর সাগর উত্তাল হয়ে উঠলে উপকূলে ফেরার পথে ২২ সেপ্টেম্বর সকালে কুয়াকাটার অদূরে ট্রলারটি ডুবে যায়। অন্য একটি ট্রলার ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মো. রাকিব ও মো. নবী হোসেন নামের দুই জেলে এখনো নিখোঁজ। ট্রলার মালিক আল আমীন জানান, তারা কেবিনে থাকায় বের হতে পারেননি। মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম সাগরে চর ও ডুবোচরের কারণে ইলিশ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যান। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগর এলাকায় ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়।
অন্যদিকে, গত ২৪ আগস্ট কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব গভীর সাগরে এফবি বরকত নামের ট্রলার ডুবে পাঁচজন জেলে নিখোঁজ হন। পরে সাইফুল মীর নামের একজনের মরদেহ মিললেও বাকি চারজনের এখনো কোনো খোঁজ নেই। নিহতের বাবা সাহাদাত মীর জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ কাওসারের ছেলে সোহেলের ভাষ্যমতে, এক মাস পার হওয়ার পর তাদের বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ। সরকারের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও মরদেহ পাওয়ার শর্ত একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইফুল মীরের বাবা সাহাদাত মীর (৬৫) বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল তার ছেলে।
এফবি স্বাধীন ট্রলারের মালিক হরিদাস জানান, কম দামি মাছে লাভ কম হওয়ায় জেলেরা ইলিশের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই পেশা এখন ট্রলার মালিক ও জেলেদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ট্রলার তৈরি করতে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা ডুবে গেলে মালিকের ফকির হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ২০০৭ সালের সিডরে নিজের একটি ট্রলার হারানোর ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। বরগুনার পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীতে এক সময়ে ইলিশের সমাহার ছিল।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ ইলিশ খায় নাকি ইলিশ মানুষকে খায় তা বুঝে উঠতে পারছি না। তিনি জেলেদের জীবনের সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপের অভাব এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার কথা তুলে ধরেন।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানিয়েছেন, সাগরের ডুবোচর ও হঠাৎ সৃষ্ট ঝড়ের কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রলারগুলো। জেলেদের নিরাপত্তা ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে তারা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ জানিয়েছেন, জেলেদের জীবন রক্ষার স্বার্থে ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা এবং নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারের তৎপরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বরগুনায় আবহাওয়া অফিস নির্মাণের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০