ইউক্রেনকে ব্রিটেনের সামরিক সহায়তা প্রদানের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাজ্য থেকে রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিনকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে রাশিয়া। সাত বছর দায়িত্ব পালনের পর গত মাসে তিনি ব্রিটেন ছাড়েন। তবে মস্কো এখন পর্যন্ত তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন কোনো রাষ্ট্রদূতের নাম ঘোষণা করেনি। বর্তমানে রুশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে শুধু ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ভাসিলি এ সিগানভের নাম দেখা যাচ্ছে।
রুশ দূতাবাসের এক মুখপাত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমসকে জানিয়েছেন, কেলিন তার দায়িত্ব পালনকালে ব্রিটেনের সঙ্গে যোগাযোগের পথগুলো সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তবে তার ভাষ্যমতে, ব্রিটিশ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে। কেলিন এই আশা নিয়ে ব্রিটেন ত্যাগ করেছেন যে, যুক্তরাজ্য যদি রাশিয়ার প্রতি তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করে, তবে ভবিষ্যতে গঠনমূলক ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক সংলাপ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত নতুন প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের বিষয়টিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে। দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, বিষয়টি রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে রাশিয়ায় ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাস সচল রয়েছে এবং সেখান থেকে রুশ সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিভিন্ন উদ্বেগ তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে লন্ডন জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের পাশে দৃঢ়ভাবে থাকবে এবং রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ইউক্রেনের রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মস্কোর এই পদক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। মস্কো ও কিয়েভে ব্রিটেনের সাবেক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে জন ফোরম্যানের মতে, রাষ্ট্রদূতের পদে সাময়িক শূন্যতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে ২০১৮ সাল থেকে সম্পর্কের অবনতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রেক্ষাপটে এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মস্কো হয়তো রাষ্ট্রদূত না পাঠিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা স্থায়ীভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
সাবেক ব্রিটিশ সেনা শওন পিনার মনে করেন, কেলিনের চলে যাওয়া দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় ঘাটতি তৈরি করবে। তার মতে, বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। পিনার আরও বলেন, মস্কো যদি অর্থবহ আলোচনায় আগ্রহ না দেখায় এবং কূটনৈতিক উপস্থিতিকে কেবল ক্রেমলিনের বক্তব্য প্রচারের কাজে ব্যবহার করে, তবে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে—এমন ধারণা করা কঠিন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেওয়া কেলিন দীর্ঘদিন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে রুশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। গত জুনে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া হারতে পারে না।
এদিকে, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের তৈরি দুটি ড্রোন ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলার কাজে ব্যবহার করেছে—এমন প্রতিবেদন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রে সত্য বলে ইঙ্গিত পাওয়ার পরই ব্রিটেনের বিরুদ্ধে মস্কোর বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। এরপর রুশ দূতাবাস টেলিগ্রামে দেওয়া বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, লন্ডনের এই পদক্ষেপের অনিবার্য পরিণতি হবে এবং এর জন্য ব্রিটেনকে জবাবদিহি করতে হবে। সব মিলিয়ে সামরিক সহায়তা ও পাল্টা হুমকির জেরে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন করে এক উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।






