মাগুরা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ‘দিনান্ত ক্লাব’-এর নামফলক সরিয়ে সেখানে ‘মাগুরা অফিসার্স ক্লাব’-এর নতুন ফলক বসানো হয়েছে। গত শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে নোমানী ময়দানসংলগ্ন আনসার অফিসের পূর্ব পাশে ক্লাবের নিজস্ব ভবনে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ। নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় সুধী সমাজ, ক্রীড়ানুরাগী ও প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কোনো আলোচনা বা জনসম্মতি ছাড়াই হঠাৎ করে নাম বদলে মাগুরার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যদিও ক্লাব প্রাঙ্গণের লন টেনিস ও ব্যাডমিন্টন মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা হতো। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসক একতরফা ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির নাম পরিবর্তন করে অফিসার্স ক্লাব করার পাঁয়তারা করছেন। তবে সেটি অন্য কোনো জায়গায় করা যেত কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারত।
দিনান্ত ক্লাবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে ক্লাবটি যাত্রা শুরু করেছিল।
শুরুতে এর নাম ছিল ‘স্টেশন ক্লাব’, যা পরবর্তীতে ‘দিনান্ত ক্লাব’ নামে পরিচিতি পায়।
৫২ শতক জমির ওপর নির্মিত ক্লাবটির নিজস্ব ভবন ও প্রাঙ্গণ রয়েছে। ২০০১ সালে ভবনটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ২০০৩ সালে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সদস্য হওয়ার সুযোগ ছিল। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনসহ সামাজিক ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে ক্লাবটি প্রাণবন্ত ছিল, তবে প্রায় দুই দশক ধরে নতুন সদস্যপদ না খোলায় এর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলার আয়োজন, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ও বাংলা নববর্ষ উদযাপনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা ছিল। গঠনতন্ত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাগুরার ২৫ বছর বয়সী যেকোনো স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং করদাতা ব্যবসায়ীদের সাধারণ সদস্য হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ জানান, দেশের অন্যান্য জেলার মতো মাগুরায়ও কর্মকর্তাদের বিনোদনের জন্য একটি স্থানের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তার দাবি, ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে ক্লাবটি কার্যকর না থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নতুন করে অফিসার্স ক্লাব চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, চাকরির বিধিনিষেধের কারণে কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বিনোদন ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় প্রস্তাবের মাধ্যমে ওই স্থানে অফিসার্স ক্লাব গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মাগুরায় এসে আমরা দেখতে পেয়েছি, গত ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে কর্মকর্তাদের বসার বা বিনোদনের মতো কোনো জায়গা নেই। এটি একসময় স্টেশন ক্লাব এবং পরে দিনান্ত ক্লাব নামে অফিসারদের ক্লাব হিসেবেই চালু ছিল, যা কোনো অজানা কারণে গত ১৫ থেকে ১৭ বছর বন্ধ ছিল। ’। ফলে তাঁরা সব সময় সবার সঙ্গে মিশতে পারেন না। তিনি চাইলে অন্য কোথাও অফিসার্স ক্লাব করতে পারতেন। ’। আমি এ বিষয় নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব। ’।
তবে জেলা প্রশাসকের এই যুক্তি মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্লাবের দীর্ঘদিনের সদস্য ও সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের চাঁদায় গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই দখল করা হয়েছে। প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ টি এম মহব্বত আলী এই ঘটনাকে একতরফা ও স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিএনপি নেতা আহসান হাবীব কিশোরও স্থানীয়দের সঙ্গে কোনো আলাপ ছাড়াই এই পরিবর্তনের সমালোচনা করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ক্লাবের সদস্য এবং সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা মাগুরার মানুষ নিজেদের শ্রম দিয়ে, লাখ লাখ টাকা চাঁদা ও অনুদান সংগ্রহ করে এই ভবন এবং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছি। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান হাবীব কিশোর।
ক্লাবের ঐতিহ্য রক্ষায় ও এটিকে জনবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠনের দাবিতে স্থানীয়রা ইতোমধ্যে পাঁচ দফা দাবি সম্বলিত একটি আবেদন জানিয়েছেন। এই আবেদনটি মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন, মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন জানান, কর্মকর্তাদের জন্য ক্লাব হতেই পারে, তবে এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।






