যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট গণনা এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন না হলেও, দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। দুজনই মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি ভোট পেয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান এবং রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের ঘটনা আগামী দিনের রাজনীতির চিত্র বদলে দিতে পারে। তবে এবারের নির্বাচনে তার সফল প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি মুহূর্ত তাকে জাতীয় পর্যায়ে আরো পরিচিত করেছে। তিনি প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন।
ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভালো ফল করা মানেই যে দুই বছর পর হোয়াইট হাউসে নিশ্চিত জয়, তা নয়।
২০১০ সালে রিপাবলিকানরা বড় সাফল্য পাওয়ার পরেও ২০১২ সালে বারাক ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই বর্তমান সাফল্যকে ডেমোক্র্যাটরা চূড়ান্ত জয়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে না। তবে এখনো কোনো প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৮ সালের লড়াইয়ের ঘোষণা না দিলেও, পর্দার আড়ালে প্রভাবশালী রাজনীতিকরা নিজেদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেসে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বাড়তি গতি ও আত্মবিশ্বাস পাবে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিককে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সেখানে জয় পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অসফ আগে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছিলেন। তবে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যটিতে তাদের দুজনেরই জয়ের ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে। এর ফলে বর্তমান প্রশাসনের নেতৃত্বে থাকা সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ
- জন অসফ: জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে নিজের অবস্থান সংহত করেছেন।
- জশ শাপিরো: পেনসিলভানিয়ার এই গভর্নর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে অনায়াসে হারিয়ে দিয়ে ২০২৮ সালের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
- জেবি প্রিটজকার: ইলিনয়ের গভর্নর হিসেবে তার এবারের প্রচারণাকে বিশ্লেষকরা প্রেসিডেন্ট পদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
- গ্যাভিন নিউজম: ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পুনর্নির্বাচনের বাইরে থাকলেও কর নীতির মাধ্যমে নিজ অঙ্গরাজ্যে বড় প্রভাব ফেলেছেন।
- রিপাবলিকান শিবিরেও টম কটন এবং স্যান্ডার্সের মতো নেতাদের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব ও ভ্যান্সের সংকট
নির্বাচনের পর বিভিন্ন জরিপ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল, যা রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম মূল কারণ। চাপের মুখে জেডি ভ্যান্স ও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই হারের দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি যুদ্ধের প্রভাবকে এই পরাজয়ের কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কারেন বেকউইথের মতে, ভোটারদের আস্থা অর্জনে রিপাবলিকানদের ব্যর্থতা ছিল এবারের প্রচারণার বড় দিক। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন চারটি দিক। তবে অঙ্গরাজ্যের ধনীদের ওপর কর আরোপের একটি প্রস্তাব নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কারেন বেকউইথ বলেছেন, এবারের নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ভ্যান্স। একই সঙ্গে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিষয়টিও সামনে এনেছেন তিনি। তবে ভোর হওয়ার ঠিক আগেই অন্ধকার সবচেয়ে গভীর হয়।
অন্যদিকে, মার্কো রুবিওর মতো নেতাদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়ার গুজব উঠলেও তিনি তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস এবং সিনেটর টেড ক্রুজও দলের বর্তমান বিপর্যয় নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এটিকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্দরে মধ্যপন্থি ও বামপন্থিদের মধ্যে ২০২৮ সালের প্রার্থিতা নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। জিম মেসিনার মতো কৌশলবিদদের মতে, অসংখ্য ডেমোক্র্যাট নেতা ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। মিশিগানে আল-সাইয়েদের জয় বামপন্থিদের জন্য বড় সাফল্যের বার্তা দিয়েছে। প্রগ্রেসিভ চেঞ্জ ক্যাম্পেইন কমিটির অ্যাডাম গ্রিন মনে করেন, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো নেতারা এখন নতুন ধারায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা রাখছেন। একই সঙ্গে ব্লু ডগ ককাসের মতো মধ্যপন্থি সংগঠনগুলো কংগ্রেসে ১৪টি আসন জিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করেছে। তাদের দাবি, বাস্তববাদী ও রক্ষণশীল ঘরানার ভোটারদের আকৃষ্ট করার সক্ষমতা বজায় রাখাই ডেমোক্র্যাটদের বড় চ্যালেঞ্জ। আরকানসাস অঙ্গরাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সিনেটর টম কটন ও গভর্নর সারা হাকাবি স্যান্ডার্স দুজনই নিজেদের পদ ধরে রাখতে পেরেছেন। স্যান্ডার্স ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ছিলেন।
ভোটারদের ভাষা ও কৌশলের পরিবর্তন
রাজনৈতিক ভাষ্যকার ক্রিস্টিনা পাসকুচ্চি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারণাকে উল্টে দিয়েছে। অ্যাটলাস গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার অভিমত, উভয় দলকেই দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে নতুন কৌশল নিতে হবে। বিশেষ করে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন পেতে রিপাবলিকানদের প্রচারে ভাষা পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন ড্রিয়েনা সিক্সটো। তার মতে, অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই বিষয়গুলোই ২০২৮ সালের নির্বাচনের আসল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। তাই প্রচলিত প্রচারণার গণ্ডি পেরিয়ে দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে পৌঁছানোই প্রার্থীদের জন্য আগামী দুই বছরের মূল লক্ষ্য হতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে গণভোটের ফলাফল তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।






