বিশ্বের অন্তত ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ বর্তমানে ক্ষুধার মুখে দিন কাটাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শস্য পরিবহন ও রপ্তানি পথগুলোতে বারবার হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কৃষ্ণসাগর, দানিয়ুব নদী এবং স্থলপথ ব্যবহার করে ইউক্রেন তাদের কৃষি পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠায়। তবে রাশিয়া সুপরিকল্পিতভাবে দেশটির বন্দর, গুদাম, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা ও পণ্যবাহী জাহাজে আঘাত হানছে। এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল ইউক্রেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা এবং জ্বালানি ও সারের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। সমুদ্রপথে পরিবহন, জ্বালানির বাজার, বাণিজ্যপ্রবাহ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের খাদ্যবাজারে ইউক্রেনের গুরুত্বের কারণেই পরিস্থিতিটি এত উদ্বেগজনক। এশিয়ার বাজারেও দেশটির কৃষিপণ্যের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের আগে বিশ্ববাজারে ইউক্রেনের অবদান ছিল বিশাল। তখন দেশটি বিশ্বের মোট ভুট্টা রপ্তানির ১৫ শতাংশ, গম রপ্তানির ১০ শতাংশ, যব রপ্তানির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং সূর্যমুখী তেল রপ্তানির পুরো ৫০ শতাংশ সরবরাহ করত। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে খাদ্য সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর ওপর। আগস্ট মাসে ইউক্রেনে ফসল কাটার মৌসুম শুরু হলেও পরিবহন ও রপ্তানি স্থাপনায় হামলার কারণে বিপুল পরিমাণ শস্য দেশের ভেতরেই আটকা পড়েছে। বাংলাদেশের এ পরিস্থিতির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত। চলতি বছরও ইউক্রেনে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সৌদি-হুতি যুদ্ধে বাংলাদেশের শ্রমিক কেন আলোচনার কেন্দ্রে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দেশটির শস্য রপ্তানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুধু তাই নয়, অক্টোবরের মধ্যে দেশটিতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জায়গার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। নভেম্বর নাগাদ শস্য, তৈলবীজ এবং প্রক্রিয়াজাত পশুখাদ্য মিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ টনের বেশি কৃষিপণ্য গুদামের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকতে পারে। ফসল বিক্রিতে ব্যর্থ হওয়ায় কৃষকদের হাতে পরবর্তী মৌসুমের বীজ বপনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে না, যা আগামী বছরের উৎপাদনকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। বিশ্বে ইতিমধ্যে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার শিকার, এই নতুন সংকট সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ উৎপাদন কমবে এবং সংকট আগামী বছরেও ছড়িয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। এ দেশে খাদ্য তালিকার দ্বিতীয় প্রধান শস্য হলো গম। বাংলাদেশ তার গম ও গমজাতীয় খাদ্যের চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভর করে। চার বছর আগের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই বাংলাদেশ সরাসরি সংকটে পড়ে। গম আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এর দাম উর্ধ্বমুখী হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ইন্ধন জোগায়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটও এর প্রমাণ। খাদ্যের দাম ও সরবরাহে নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য সবচেয়ে কম যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠীর, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ দেশে গম দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত খাদ্যশস্য। গম ও গমজাতীয় খাবারের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে বাংলাদেশ। দেশে মূল্যস্ফীতিও দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।
রাশিয়া শুরু থেকেই খাদ্যসংকটকে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইউক্রেনের রপ্তানি পথগুলোকে অকার্যকর করে তারা কেবল কিয়েভকে দুর্বল করার কৌশল নেয়নি, বরং খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব কতটুকু চাপ নিতে পারে, তা-ও পরীক্ষা করছে। স্থলপথ ও নদীপথের বিকল্প ব্যবস্থা ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমালেও, বিশ্ববাজারের বিশাল চাহিদা মেটাতে নিরাপদ সমুদ্রপথের কোনো বিকল্প নেই। সমুদ্রপথে অবাধ জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা আজ বৈশ্বিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খাদ্যসংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা দেশটির বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্য অবাধ ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বেসামরিক জাহাজ ও শস্য রপ্তানি অবকাঠামোয় হামলা অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। এটি কেবল অবকাঠামো রক্ষার বিষয় নয়, বরং কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ব্যবসার নিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করারও পূর্বশর্ত। খাদ্যকে যুদ্ধের আরেকটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সারশিল্পকে না বাঁচালে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না। লোকায়ত কৃষিকে উপেক্ষা করে খাদ্যনিরাপত্তা সম্ভব।
ইউক্রেনীয়দের প্রতিদিনের দুর্ভোগ লাঘবে এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে এমন একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে।
রাশিয়া বাণিজ্যিক জীবনরেখায় হামলা বন্ধ করলে তার সুফল কেবল ইউরোপের সীমানায় আটকে থাকবে না, বরং বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই স্বস্তি ফিরে আসবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, খাদ্যনিরাপত্তা শুধু অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নয়, বরং নিরাপদ সমুদ্রপথের আমদানির ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল। এই যৌথ সতর্কবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেনের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারবৃন্দ।






