মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় নাব্যতা হারিয়ে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে একাধিক ঐতিহ্যবাহী নদ-নদী। দীর্ঘদিন নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন না হওয়া, পলি জমে তলদেশ ভরাট এবং দুই তীরের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ার কারণে নদীগুলো চরে পরিণত হচ্ছে। কোথাও নদের গতিপথ বদলে গেছে, আবার কোথাও শুধু বর্ষাকালে পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে ফসলি জমিতে রূপ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলের নৌযোগাযোগ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের ভারসাম্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় জেলার বেশ কয়েকটি নদী নাব্য হারিয়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে কোনো কোনো নদীর গতিপথও। শুধু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহই নয়, এর সঙ্গে জড়িত নৌপথ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশও পড়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। বর্ষায় নদীটি পানিতে ভরপুর থাকলেও শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে পানি শুকিয়ে যায়। একসময় এই ময়নাকাটা নদী দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, কাগজে-কলমে মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ১৭টি নদ-নদীর উল্লেখ থাকলেও বাস্তব চিত্রে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত পদ্মা, পালরদী ও ময়নাকাটাসহ মাত্র ১০টি নদীর অস্তিত্ব চোখে পড়ে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাকিগুলোর প্রবাহপথ পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। তবে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মা, পালরদী ও ময়নাকাটাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর মধ্যে দৃশ্যমান রয়েছে মাত্র ১০টি।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শিরুয়াইল, নিলখী, বাঁশকান্দি, পাচ্চর, দ্বিতীয়াখণ্ড ও শিবচর পৌর এলাকার নদীগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক। বিশেষ করে শিরুয়াইল থেকে নিলখী হয়ে প্রবাহিত আড়িয়াল খাঁ নদের একটি অংশ সংকুচিত হয়ে বর্তমানে স্থানীয় মানুষের কাছে ‘মরা আড়িয়াল খাঁ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্ষায় কিছু পানি জমলেও বছরের অধিকাংশ সময় চরে পরিণত হওয়া নদীটির বুকে এখন ফসল চাষ করা হচ্ছে।
শিরুয়াইল বাজারের পাশের বাসিন্দা রানা হামিদ এই দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, একসময় যে নদীতে বড় বড় জলযান চলত, সেখানে এখন নদীর আর কোনো গতিপথই অবশিষ্ট নেই। শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ চর জেগে ওঠে আর বর্ষায় কেবল কিছু পানি জমে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে এই নদের বাকি অংশও মানচিত্র থেকে মুছে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এককালের জীবন-জীবিকা ও যোগাযোগের মাধ্যম এই নদীগুলো যেন কেবল মানচিত্র আর স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে—এটাই এখন শিবচরের নদীপাড়ের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
একইভাবে সংকটে রয়েছে শিবচর শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ময়নাকাটা নদী। নদীর পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ার সুযোগে এর দুই তীরের বিভিন্ন স্থান দখল ও ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময়েই ময়নাকাটার চরাঞ্চল ভরাট করে আবাসন ও নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, ‘ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী (দাদাভাই) শিবচর উপশহর’ নির্মাণ করতে গিয়ে নদীর চরের অনেকটা অংশ ভরাট ও দখল করা হয়েছে, যার প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ।
বাঁশকান্দি এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিলপদ্মা নদীর চিত্রও একই রকম। শুম্ভুক গ্রামের বাসিন্দা জরিনা খাতুন আফসোস করে বলেন, একসময় যে নদীতে রুট হিসেবে নিয়মিত বড় বড় লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল করত, তা পলি জমে এখন শুকিয়ে গেছে। অবিলম্বে নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ড্রেজিং বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
পদ্মা নদীর সংলগ্ন এলাকাগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। কুতুবপুর ও দ্বিতীয়াখণ্ড এলাকায় পুরোনো নদী প্রবাহপথগুলো পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। এ ছাড়া মাদবরেরচর এবং পদ্মা সেতুর আশেপাশের এলাকা জুড়ে শুকনো মৌসুমে বিশাল চরের সৃষ্টি হচ্ছে। নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পলি সঞ্চয় প্রাকৃতিক হলেও নদী রক্ষা ও পানির প্রবাহ সচল রাখতে বিজ্ঞানসম্মত পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষা চালানো অত্যন্ত জরুরি।
নদ-নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে শিবচরের বাসিন্দাদের মধ্যে। বিশিষ্ট সমাজসেবক বাবুল গোমস্তা জানান, একটি সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব শিবচর গড়ে তুলতে হলে সবার আগে ময়নাকাটা নদীকে দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা নদীগুলোর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিতকরণ, দখলদারদের উচ্ছেদ এবং দ্রত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খননকাজ শুরুর জোর দাবি জানিয়েছেন।
শিবচরের নদীগুলো রক্ষার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, নদী ও খালগুলোর অবস্থা পুনরুদ্ধারে তারা পরিকল্পনা করছেন। তবে বিআরএস নকশা ও পর্চায় নদীর সঠিক সীমানা নির্ধারণে জটিলতা থাকায় উপজেলার প্রতিটি জলাশয়ের প্রকৃত তথ্য বের করার প্রক্রিয়া চলছে। কাগজপত্র চূড়ান্ত হলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ও সংস্কার মূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির স্বীকার করেন যে ময়নাকাটাসহ উপজেলার বহু নদীর প্রবাহ দখলের কারণে বন্ধ হওয়ার পথে। তবে তিনি স্পষ্ট জানান, এই মুহূর্তে এই নদীগুলো পুনঃখনন বা দখলমুক্ত করার নির্দিষ্ট কোনো ড্রেজিং প্রকল্প তাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও বরাদ্দ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সরকারি দপ্তরের এমন বক্তব্যে স্থানীয়দের হতাশা আরও বেড়েছে।






