কমিশন বৃদ্ধি, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ এবং বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সংগঠনের নেতাদের হুঁশিয়ারি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে পরবর্তীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হবে। এই ঘোষণা দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ গ্রাহকরা। বাস্তব চিত্রে দেশের কোথাও এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত এই পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার কারণেই আমরা ১৫ ও ১৬ অক্টোবর বন্ধের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ও রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে আলাপকালে বাজারে চরম অস্থিরতার চিত্র উঠে আসে। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান জানান, বিইআরসি নির্ধারিত কমিশন বর্তমানে অত্যন্ত অপ্রতুল। দোকান ভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ সামলে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা ও প্রশাসনিক হয়রানির কারণে ব্যবসায়ীরা পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ও রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ধর্মঘটের ঘোষণার সুযোগ নিয়ে বাজারে শুরু হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে লোকসান এড়াতে তারা সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পরিবহন খরচ, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ ধরে যে কমিশন দেওয়া হয়, তাতে ব্যবসায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তদুপরি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
অথচ বাস্তবে বাজারে এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই। তথ্যমতে, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আমদানি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে কিছু আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। মূলত নতুন দরে বিক্রির আশায় হাজার হাজার টন গ্যাস অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। বাজারে খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার এখন ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অথচ ৪ অক্টোবর বিইআরসি এর দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছিল। গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১, ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে।
এ বিষয়ে আমদানিকারকদের সংগঠন ‘লোয়াব’ কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ নাকচ করেছে। তারা বলছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সন্তোষজনক। যদি কোনো পরিবেশক বা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেয় বা বেআইনি মজুত করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিইআরসি-র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করেই দাম নির্ধারণ করে। অতিরিক্ত দামে বিক্রয় আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীদের পাল্লায় পড়ে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সাজিদুর রহমান বলেন, এমনিতেই বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, তার ওপর ধর্মঘটের ঘোষণায় বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠছে। হাজারীবাগের গৃহিণী তাহমিনা বেগম জানান, ব্যবসায়ীদের সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু বিক্রি বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাবান্না অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু সরকারি এই নির্দেশনা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রশাসনের নজরদারি ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভাবে এলপিজি খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। নিজেদের স্বার্থে যখন-তখন বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জরুরি ভিত্তিতে নিয়মিত বাজার তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন।





