পবন ঝাউয়ের সাথে আমার সখ্য প্রায় চার দশকের পুরনো। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ১৯৮৫ সাল নাগাদ আমি ঝাউগাছ রোপণের সাথে যুক্ত হই। যদিও আমার পারিবারিক বসতভিটার ইতিহাস আরও পুরনো। ১৯৬৭ সালে বাবা পুরনো বাড়ির সামনে নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন এবং ১৯৭১ সাল থেকে আমরা সেখানে স্থায়ী হই। সেই সুবাদে বাড়ির আঙিনা ও সংযোগ সড়কের দুই পাশে ৩০টির মতো গাছ লাগিয়েছিলাম, যা দ্রুত বড় হয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই উচ্চতায় পৌঁছায়। পবন ঝাউয়ের সঙ্গে সখ্য অন্তত ৪০ বছর আগে থেকে। ১৯৬৭ সালে আব্বা আমাদের পুরোনো বাড়ির সামনে নতুন বাড়িটি তৈরির কাজ শুরু করেন। অবশ্য ঝাউগাছ লাগানো হয় আরও অনেক বছর পর, ১৯৮৫ সালের দিকে। আমি আর আমার এক কাজিন উঠানের কিছু অংশ আলাদা করে বাগান করার কাজে মেতে উঠি।
এই গাছটির নামকরণ নিয়ে বেশ মজার একটি স্মৃতি আছে। বাড়ির উঠানে বসে বাতাসের ঝাপটায় যখন ঝাউগাছে শোঁ শোঁ শব্দ হতো, তখন আমরা বেশ অবাক হতাম। গ্রামের সাধারণ মানুষ বাতাসের সঙ্গে শব্দের মিল থাকায় একে ‘পোবন’ বা পবন গাছ বলে ডাকত। পরবর্তীতে বরেণ্য প্রকৃতিবিদ অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে আলাপ করে আমি গাছটির নাম ‘পবন ঝাউ’ রাখার প্রস্তাব করি। তিনি এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেন এবং তাঁর শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণেও এই নামটি অন্তর্ভুক্ত করেন। এর আগে এটি ‘বিলাতি ঝাউ’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। একদিন বিকেলে বাড়ির উঠানে সবাই গল্প করছি।
২০২৫ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বেপজার সীমানাদেয়ালের পাশে ইছাখালী এলাকায় গিয়ে পবন ঝাউয়ের এক অসামান্য রূপ দেখতে পাই। সচরাচর আমরা এই গাছকে আবাদি হিসেবেই চিনি, কিন্তু সেখানে জোয়ার-ভাটার প্রতিকূলতা জয় করে বীজ থেকে চারা হয়ে এরা যেভাবে প্রাকৃতিক বন গড়ে তুলেছে, তা বিস্ময়কর। মূলত উপকূলীয় এলাকা ও সাগরপাড়ে এদের আধিক্য বেশি থাকলেও সারা দেশে এদের দেখা পাওয়া যায়।
অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তাঁর লেখায় পবন ঝাউয়ের সাথে পাইনের সাদৃশ্য ও পার্থক্যের একটি দারুণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাইনের সঙ্গে এর ফলক ও স্বননের অনেক মিল থাকলেও উদ্ভিদবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাসে এদের কোনো আত্মীয়তা নেই। পাইন নগ্নবীজ উদ্ভিদ হলেও পবন ঝাউ আম বা বকুলের মতোই আবৃতবীজ উদ্ভিদ। পরিণত পবন ঝাউ গাছ ৬ থেকে ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, যেখানে নবীন গাছগুলো সাধারণত পিরামিডাকৃতির হয়। এর কাণ্ড ধূসর ও রুক্ষ, আর পাতাগুলো বাদামি রোমে রূপান্তরিত। কয়েক বছরের মধ্যে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠল।
বছরে দুইবার, অর্থাৎ গ্রীষ্মের শুরু ও হেমন্তের শেষে এই গাছে ছোট ও জৌলুশহীন ফুল ফোটে। এর বীজগুলো অত্যন্ত হালকা ও বাদামি রঙের হয়। বাস্তুসংস্থানের দিক থেকে বালুভূমির প্রসার রোধে পবন ঝাউয়ের বলয় অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া এর কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী এবং আলংকারিক বৃক্ষ হিসেবে বাগান বা উদ্যানের সৌন্দর্য বাড়াতেও এটি দারুণ কার্যকর।




