পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বায়েক) পাইওনিয়ার বেইজে অগ্নিকাণ্ডের দীর্ঘ ৮০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় প্রকল্পের অভ্যন্তরে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পাইওনিয়ার বেইজ ভবনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে কাজ করা, ওয়াশরুম ব্যবহার ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে চরম সমস্যায় পড়ছেন। আগুনে অভ্যন্তরীণ সার্ভার ও আইটি সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকল্পের বিভিন্ন দপ্তরের দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও পানি না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।
সেবা বিচ্ছিন্ন ও ভোগান্তির চিত্র
- বর্তমানে পাইওনিয়ার বেইজ, ক্যান্টিন, কাস্টমস ভবন ও বায়েকের মসজিদে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।
- পাইওনিয়ার বেইজ, কাস্টমস বিল্ডিং, ১.৬ বিল্ডিং, ট্রেনিং সেন্টার ও মেডিকেল সেন্টারে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
- পাইওনিয়ার বেইজ, কাস্টমস ভবন ও ক্যান্টিনে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় ওয়াশরুম ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
- মসজিদে পানির ব্যবস্থা করা হলেও বিদ্যুতের অভাবে নামাজ আদায়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
- ক্যান্টিনে দুই দিন রান্না বন্ধ থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে বাইরে খাবার খেতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বুধবার বিকেলে ক্যান্টিনে বিদ্যুৎ আসায় খাবার পাওয়া গেলেও অন্যান্য স্থানগুলোতে দ্রুত সেবা স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার আবুল হাশেম জানান, ৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে একটি স্প্লিট-টাইপ এসির ইনডোর ইউনিটের বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করছে।
নথিপত্র ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট অফিসের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, আগুনে কিছু নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলোর ব্যাকআপ কপি সংরক্ষিত রয়েছে। তবে সার্ভার স্টেশনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং তা স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকল্পের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের সময়ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। বুধবার রাতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট সৈকত আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ড মূল স্থাপনার বাইরে একটি অস্থায়ী ভবনে সীমাবদ্ধ ছিল এবং প্রকল্পের নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, অস্থায়ী ভবনের দুটি কক্ষের আসবাবপত্র, নথিপত্র ও আইটি সরঞ্জাম আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষতি নিরূপণে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল কেটে দেন, ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার দাবি করা হলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর অবস্থায় কাজ করছেন। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে দাপ্তরিক কাজে ধীরগতি নেমে এসেছে, যা প্রকল্পের সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।






