ক্রিকেটের সাফল্যের এক নিজস্ব সমীকরণ আছে। খেলোয়াড় কতটা দক্ষ, তার চেয়ে অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে তার জয়ের ক্ষুধা। তবে এই ক্ষুধা মাপার কোনো যন্ত্র নেই। কোনো খেলোয়াড় যখন জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর আচরণেই ফুটে ওঠে সেই জেদ। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তানের ১৮ বছর বয়সী তরুণ শাদাব খানকে যেমন দেখা গিয়েছিল, ঠিক তেমনই এক মরিয়া রূপ গতকাল লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ফুটে উঠল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আপনি কতটা ভালো খেলোয়াড়, সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে আপনি কতটা ভালো খেলতে চান। থাকলে হয়তো বোঝা যেত, একজন ভালো খেলোয়াড় আর একজন অসাধারণ খেলোয়াড়ের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায়। ২০১৭ সালের এক গ্রীষ্মের দুপুরের কথা মনে পড়ে কিনা দেখুন। ইংল্যান্ডের ৪ উইকেট পড়ে গিয়েছিল পঞ্চাশের কিছু বেশি রানে। কিন্তু বেন ডাকেট ও স্যাম কারেন পঞ্চম উইকেটে জুটি গড়ে ম্যাচটা ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পাকিস্তানের অধিনায়কও যেন আক্রমণের বদলে আত্মরক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন। শাদাবের সাম্প্রতিক বোলিং পরিসংখ্যান দেখলে অবশ্য তাঁর এমন মরিয়া হওয়ার কারণটা বোঝা যায়। একটি উইকেট পেতে গড়ে ৫৭.৫ বল করতে হয়েছে। জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তারপর কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে সব ভেঙে পড়ে। নিখুঁত টাইমিংয়ে বল ছুটছে বাউন্ডারির দিকে। গাস অ্যাটকিনসনের বল শাদাবের প্যাডে।
সেই সময় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কোহলির ক্যাচ ধরার পাশাপাশি যুবরাজ সিংয়ের এলবিডব্লুর আবেদনে আত্মবিশ্বাসী শাদাব সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ আগেই বিরাট কোহলির ক্যাচ ধরেছেন। আগের বলেই কোহলির ক্যাচ ফেলে পাকিস্তানকে হতাশ করেছিলেন আজহার আলী। বিশ্বাস না হলে স্টুয়ার্ট ব্রডকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
আম্পায়ার আউট না দিলেও তরুণ শাদাবের জোরাজুরিতে রিভিউ নিয়ে সফল হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু শাদাবের আত্মবিশ্বাস সেদিন মিথ্যা বলেনি।
সেই ২৭ বছর বয়সী শাদাব এখন অনেক বেশি অভিজ্ঞ, তবে মাঝের কয়েক বছর তাঁর ক্রিকেটে উত্থান-পতনের জোয়ার-ভাটা চলেছে। একের পর এক ওভার করাচ্ছেন স্পিনারদের দিয়ে। স্পিনারদের সহায়ক উইকেটেও শাদাব নিতে পেরেছিলেন মাত্র ২ উইকেট।
২০২৩ সালের আগে ৫১ ওয়ানডে ম্যাচে ৭০ উইকেট নেওয়া এই বোলার পরবর্তীতে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পতনটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে ২০২৩ বিশ্বকাপে।
২০ ইনিংসে মাত্র ১৭ উইকেট এবং বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স তাঁকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দেয়।
স্বজনপ্রীতি বা কোচের প্রিয়পাত্র হওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ইংল্যান্ড সিরিজের এই ম্যাচেও পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর ছিল না। ইংল্যান্ডের ২৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে। তবে এরপরই শুরু হয় এক মহাকাব্যিক লড়াই। এক প্রান্তে শাদাব খান, অন্য প্রান্তে ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হারিস রউফ। তাঁরা যেন ক্রিকেটের সনাতন নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। প্যাডল সুইপ, রিভার্স সুইপ কিংবা কবজির মোচড়ে ফ্লিক—শাদাবের ব্যাটে যেন ব্যাটিং শিল্পের এক প্রদর্শনী চলছিল। সমর্থকদের আনন্দের উপলক্ষ খুব কমই এসেছে। মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শাদাব ও হারিস।
ম্যাচের মোড় ঘোরানো সেই ৪৫তম ওভারে শাদাবকে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৩ রান দূরে থাকা শাদাব হতাশায় রিভিউ নেওয়ার কথাও ভুলে গিয়েছিলেন। ঠিক তখনই হারিস রউফের ধমকপূর্ণ সেই কথা, ‘রিভিউটা কি বাড়িতে নিয়ে যাবে?’ সেই দুই সেকেন্ডের তাগিদেই রিভিউ নিলেন শাদাব। আলট্রাএজে দেখা গেল বল ব্যাটে ছুঁয়েছে, বেঁচে গেলেন তিনি। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে থাকা সেই মানুষটির ব্যাটে তখনো বোলারদের তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা। পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো রিভিউ নেওয়ার জন্য অধিনায়ককে রাজি করানো। সবচেয়ে বেশি বদলেছে সম্ভবত তাঁর ক্রিকেটজীবন।
এই জয়ের পেছনে শাদাবের পরিশ্রমের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ২৪.১, যা এখন প্রায় ৪০-এর কাছাকাছি। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বড় পাওয়ার হিটারদের কাছ থেকে তিনি টাইমিং ও বেসিক সুইংয়ের খুঁটিনাটি শিখেছেন। আজ তিনি সাত বা তার নিচের পজিশনে ব্যাট করা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারদের অন্যতম।
তবে জয়ের শেষ মুহূর্তটিও ছিল নাটকীয়। ইংল্যান্ড ফিল্ডাররা হারিসকে চাপে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। শাদাব তাঁকে সিঙ্গেল নিয়ে প্রান্ত বদলের পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু হারিস রাজি হননি। হারিসের জেদি আবদার ছিল, ‘জয়সূচক শটটা আমিই মারব।’ শেষ পর্যন্ত চার মেরে ম্যাচ জিতিয়ে হারিস তাঁর কথা রেখেছেন।
এই জয় কেবল পাকিস্তান দলের জন্য নয়, বরং শাদাবের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্যও এক নতুন বাঁক। টানা সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি নিজের শতভাগ দিয়ে খেলার মন্ত্রে অবিচল। লাহোরের এই ম্যাচে শাদাব ও হারিস যে জুটি গড়েছেন, তা ১৯৭৫ সাল থেকে ওয়ানডেতে সফল রান তাড়ার ক্ষেত্রে দশম উইকেটের সর্বোচ্চ জুটির ৫১ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অনিশ্চিত যাত্রায় এই জয় এক অনন্য সংযোজন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে শোনা গেছে হারিসের সেই কথা।






