
বাংলাদেশে সরকারি সহায়তা ও নাগরিক পরিচয় নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের কার্ড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রেশন কার্ড থেকে শুরু করে ভিজিএফ, ভিজিডি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং সর্বশেষ ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তৈরি। তবে এসব কার্ডের পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএন-এর মতো একাধিক পরিচয়পত্র থাকায় নাগরিক সেবায় সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। এই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাকে একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনতে সরকার ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এই অঞ্চলে কার্ডভিত্তিক খাদ্য বিতরণের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার শহরাঞ্চলে বিধিবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থা বহাল ছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় রেশন কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। খাদ্যশস্যের অপচয়, আত্মসাৎ, ভুয়া বিতরণ এবং কালোবাজারে পণ্য বিক্রির মতো ঘটনাগুলো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় সরকারি ভর্তুকির খাদ্য প্রভাবশালী মহলের কাছে বেশি পৌঁছানোর অভিযোগও বেশ আলোচিত ছিল। ফলে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে রেশনব্যবস্থা কার্যত বিলুপ্ত করা হয়, যদিও সেনাবাহিনী ও পুলিশের মতো শৃঙ্খলা বাহিনীতে এটি এখনো চালু রয়েছে।
রেশনব্যবস্থা সংকুচিত হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্ডের ব্যবহার থামেনি। বরং ভিজিএফ, ভিজিডি, প্রতিবন্ধী ভাতা ও টিসিবি কার্ডের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। বর্তমান সরকারও এই ধারায় নতুন নতুন কার্ড যুক্ত করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফ্যামিলি কার্ড, যা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চালু করা হয়েছে। গত ১০ মার্চ ১৪টি উপজেলায় এই কার্ডের পাইলট কর্মসূচি শুরু হয়, যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
কৃষকদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’। গত ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিন এর প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়িত এই কার্ডের সুবিধা শুধু ফসল উৎপাদনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্গাচাষি, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও ইজারা চাষিরাও এর আওতায় থাকছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ, কীটনাশক ভর্তুকি, কৃষিঋণ, সেচ সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার পথ সুগম হবে। এছাড়া প্রবাসী কার্ড এবং ন্যাশনাল হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগগুলোও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
বিভিন্ন সেবার জন্য আলাদা কার্ডের বদলে একটি একক পরিচয়পত্র তৈরির ভাবনা থেকে ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ‘ডি-স্টার’ প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পে ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও কার্ড মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ কোটি। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থায় জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিককে একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সরকার বলছে, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’—এই মূলমন্ত্রে সব সেবা একীভূত করা হবে। এর ফলে এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো বিদ্যমান আলাদা কার্ডের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০০টির বেশি সরকারি সেবা ইতিমধ্যে এই ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ এই পথে এগোচ্ছে। সিঙ্গাপুরের ‘সিংপাস’ ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নাগরিকরা স্বাস্থ্য, কর ও আবাসনসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেন। ভারতের ‘আধার’ কার্ড ১২ অঙ্কের অনন্য নম্বর হিসেবে বায়োমেট্রিক ও জনমিতির তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ‘গভ.ইউকে ওয়ান লগইন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ও পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সেবা একীভূত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, সেখানে সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর (এসএসএন) ও ড্রাইভিং লাইসেন্সই পরিচয়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে বর্তমানের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা জরুরি। ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও সমন্বিত পরিচয়ের আওতায় এনে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই কীভাবে আরও কার্যকরভাবে একক পরিচয়ব্যবস্থায় রূপান্তর করা যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সব মিলিয়ে, একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়পত্র নাগরিক ভোগান্তি কমিয়ে সরকারি সেবাকে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবায় সারা জীবন একই পরিচয় ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর এত কার্ডের পর কেন আবার এক পরিচয়পত্রের (আইডি) প্রয়োজন দেখা দিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেশন কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ কম দামে চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য কিনতে পারতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টাকা দিলেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে ‘কল ডিটেল রেকর্ড, অবস্থানের তথ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভিন্ন সময়ে এসব অনিয়মের সঙ্গে তৎকালীন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের নামও এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রশাসনিক দুর্নীতি, মজুতদারি ও খাদ্যশস্য পাচারের বিষয়ও আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর বদলে সরকার কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা অর্থ দেওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে আছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও টেস্ট রিলিফ (টিআর)।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০