বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এবং চলমান বিভিন্ন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা আগস্ট মাসে খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মাসিক মূল্য পরিবর্তনের গড় সূচক আগস্টে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জুলাই মাসে এই সূচকটি ছিল ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্ট। এই মূল্যবৃদ্ধি ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে সর্বোচ্চ। এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো এই পরিস্থিতিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, বাজারে ঝুঁকি পুনরায় ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
খাদ্যপণ্যের বিভিন্ন খাতের মধ্যে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া ভোজ্যতেলের সূচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। চিনির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; এর মূল্যসূচক ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।
ইউরোপের প্রতিকূল আবহাওয়া, বিশেষ করে তীব্র দাবদাহ ও খরার কারণে ভুট্টা ও বিট থেকে চিনি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। একইসঙ্গে গবাদিপশু পালনের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে, প্রত্যাশিত এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় পাম তেল ও চিনি উৎপাদন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক কারণগুলোকেও দায়ী করেছে এফএও। সংস্থাটি জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে শস্য চালান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সার সরবরাহ ব্যবস্থা সংকটের মুখে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারণে কৃষিপণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে দামকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
উৎপাদন হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়ে এফএও জানায়, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা জুলাইয়ের আগের হিসাব থেকে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কমিয়ে ২ দশমিক ৯৮০ বিলিয়ন টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের তুলনায় ২ শতাংশ কম এবং ২০১৮ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ বার্ষিক পতন।
উল্লেখ্য, এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে স্থানীয় পর্যায়েও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার এবং এলএনজিতে ভর্তুকি তিন গুণ বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির এই প্রবণতা দরিদ্র দেশগুলোর কোটি মানুষের জন্য ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের শস্যভাণ্ডারে রুশ হামলার মতো ঘটনাগুলো বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো নিত্যপণ্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, এলএনজিতে ভর্তুকি বেড়ে হতে পারে ৩ গুণ।






