
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা ‘সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার’—এই প্রাচীন সংস্কৃত প্রবাদটি তুলে ধরে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে এই আদর্শের কথা বলা যতটা সহজ, বাস্তব রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করা ততটাই কঠিন। মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ এবং অবিশ্বাসের দেয়াল এই দার্শনিক ধারণার বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকে যদি প্রকৃতপক্ষেই একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করতে হয়, তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরাজমান বিরোধ মেটাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সমঝোতার বিকল্প নেই। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের দাবি করলে প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে আলোচনার টেবিলে বসাটাই হবে পরিণত ও দায়িত্বশীল আচরণ। এমন উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে।
ব্রিকসের গতানুগতিক রাজনৈতিক অবস্থানেরও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে চীনের শিয়ামেন সম্মেলনে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাম সরাসরি উল্লেখ করে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এবারের দিল্লি সম্মেলনে সরাসরি সংঘাতের চেয়ে ঐকমত্য বজায় রাখার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। বিষয়টিকে ব্রিকসের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
‘বিশ্ব পরিবার’ ধারণার স্বার্থকতা নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক আচরণের ওপর। অন্য দেশের আগ্রাসন বা দমননীতির পাশে না দাঁড়িয়ে মানবাধিকার ও সমতাকে গুরুত্ব দেওয়াই এর মূল শর্ত। একই সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তে সহিংসতা ও গণপিটুনির মতো জঘন্য ঘটনা বন্ধ করা জরুরি। মানবিক মর্যাদা ও সমতার এই দর্শনকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলা ও ডেসমন্ড টুটুর ‘উবুন্টু’ বা ‘আমি আছি, কারণ আমরা আছি’ দর্শনের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম্মানের বিষয়টিই প্রধান।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সম্মেলনে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্রিকসের জোরালো ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ব্রিকসের উচিত সংঘাতের শুধু উপরিভাগের লক্ষণ নয়, বরং মূল কারণগুলো খুঁজে বের করা। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ফিলিস্তিন সংকটে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষেও তিনি জোরালো মত দিয়েছেন, যা ব্রিকসকে শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট থেকে আন্তর্জাতিক শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারে।
ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাইবেল বা ভারতীয় উপনিষদেও মানবজাতিকে একক সত্তার অংশ হিসেবে দেখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বারবার সেই আদর্শকে খণ্ডিত করে ফেলেছে। দিনশেষে বিশ্বকে সত্যিই একটি পরিবারে রূপান্তর করতে হলে শুধু সম্মেলনের মঞ্চে ঐক্যের বুলি আওড়ালে চলবে না, বরং রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। শক্তি প্রদর্শন বা আধিপত্য নয়, বরং সংলাপ ও সমতাই হোক আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন ভিত্তি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০