
প্রকৃতি এবং অর্থনীতির মধ্যকার জটিল সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় অনন্য অবদান রাখা নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ডি. নর্ডহাউস ৮৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক গত ৩০ অক্টোবর মারা যান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। এগুলো একবার ব্যবহার হয়ে গেলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। নর্ডহাউস এই বিতর্ককে সরলভাবে দেখেননি।
উইলিয়াম ডি.
নর্ডহাউসের জন্ম ১৯৪১ সালের ৩১ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কিতে।
তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ১৯৬৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
একই বছর থেকে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রভোস্টসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদে কাজ করেছেন।
অর্থনীতিকে কেবল মুনাফা বা বাজারের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি মানবকল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ছিল নর্ডহাউসের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে অনবায়নযোগ্য বা নিঃশেষযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের অর্থনীতির ওপর তিনি বিশেষ আলোকপাত করেন। তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো সীমিত সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বর্তমান চাহিদার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা তার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। অর্থনীতি বলতে সাধারণত উৎপাদন, আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ কিংবা বাজারের হিসাবকেই বোঝানো হয়। ফলে এসব সম্পদ কী হারে উত্তোলন ও ব্যবহার করা হবে, বর্তমানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কতটা অবশিষ্ট রাখা হবে—এসব প্রশ্ন অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা কয়লা পুড়িয়ে পণ্য উৎপাদন করলে জ্বালানির দাম ও উৎপাদন ব্যয় হিসাব করে। তার মৃত্যুতে অর্থনীতির এমন এক গবেষকের বিদায় ঘটল, যিনি দেখিয়েছেন—প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা যায় না।
১৯৭০-এর দশকে যখন বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল, তখন নর্ডহাউস এ বিষয়ে নতুন দিকনির্দেশনা দেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘দ্য অ্যালোকেশন অব এনার্জি রিসোর্সেস’-এ তিনি জ্বালানি সম্পদের কার্যকর বণ্টন ও বাজারব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। তার মতে, কোনো সম্পদ সীমিত হলেই যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, এমনটি নয়; বরং প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং বিকল্প সম্পদের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে উত্তোলনের খরচ ও বাজার আচরণ বিশ্লেষণ করা জরুরি। তার মতে, জলবায়ু চুক্তিতে অংশ নেওয়া ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রণোদনা থাকা জরুরি।
নর্ডহাউসের সবচেয়ে আলোচিত অবদান জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ। তিনি দেখিয়েছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কার্বন নিঃসরণ পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, যা বাজারের প্রচলিত পণ্যের মূল্যে প্রতিফলিত হয় না। অর্থনীতিতে এই সমস্যা ‘বহিঃপ্রভাব’ বা এক্সটার্নালিটি হিসেবে পরিচিত। তিনি কার্বন নিঃসরণের ফলে সমাজ ও কৃষিজমির যে ক্ষতি হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কার্বন নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির ক্ষতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা মানুষের জীবনযাত্রায় যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, তা পণ্যের বাজারদরে সরাসরি যুক্ত থাকে না। অন্যথায় দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বা ভোক্তা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচে জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে, আর ক্ষতির বোঝা বহন করবে পুরো সমাজ। অর্থাৎ দূষণের খরচ শুধু সমাজের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে যারা নিঃসরণ করছে, তাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেও সেই খরচ যুক্ত করতে হবে।
এই গবেষণাকে বাস্তব কাঠামোর রূপ দিতে তিনি ১৯৯২ সালে ‘ডাইস’ (ডাইনামিক ইন্টিগ্রেটেড ক্লাইমেট-ইকোনমি) মডেল তৈরি করেন। এই মডেলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিকে একই কাঠামোয় বিশ্লেষণ করা হয়। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা জলবায়ু সুরক্ষার খরচ এবং ব্যবস্থা না নেওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতির তুলনা করতে পারেন। কার্বন করের ধারণা জনপ্রিয় করার পেছনেও তার জোরালো ভূমিকা ছিল, যা দূষণকারীকে তাদের কাজের অর্থনৈতিক দায় নিতে বাধ্য করে। তার প্রস্তাবিত মডেল ও নীতির সব অনুমান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন যেহেতু একটি বৈশ্বিক সংকট, তাই কোনো একটি দেশের একক উদ্যোগ যে যথেষ্ট নয়, সেটিও নর্ডহাউস তার গবেষণায় উল্লেখ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করেন এবং ‘ক্লাইমেট ক্লাব’ বা জলবায়ু জোটের ধারণা সামনে আনেন। আগ্রহী দেশগুলো জোট গঠন করে পারস্পরিক বাণিজ্যিক শর্ত ও সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ সফল করতে পারে বলে তিনি মনে করতেন। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিকল্প সম্পদ ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও সামনে আসছিল। এখানেই তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দুর্বলতা এবং ‘ফ্রি রাইডিং’ বা অন্যের উদ্যোগের সুফল বিনা খরচে ভোগ করার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন।
শিক্ষাবিদ হিসেবেও তার অবদান ছিল অপরিসীম। অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের সঙ্গে তিনি বিশ্বখ্যাত অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ের সহলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে এই পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর স্যামুয়েলসনের মৃত্যুর পরও তিনি নিয়মিত এর সংস্করণগুলো হালনাগাদ করেছেন।
নর্ডহাউসের কাজের মূল দর্শন ছিল, অর্থনৈতিক উন্নয়নের হিসাব করার সময় প্রকৃতির ক্ষতি বা পরিবেশগত ব্যয়কে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশের সংকট হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে অর্থনীতি, নীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার সমন্বয় হিসেবে দেখার যে পথ তিনি তৈরি করে গেছেন, তা আধুনিক অর্থনীতি শাস্ত্রে এক অনন্য ভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। তার প্রয়াণে বিশ্ব অর্থনীতিবিদ মহলে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০