যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ২৪২টি পদের বিপরীতে প্রায় তিন লাখ প্রার্থী আবেদন করেছিলেন, যাঁদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। নির্ধারিত দিনে ওএমআর শিট বিতরণের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর পরীক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। কারওয়ান বাজার মেট্রোরেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক পরীক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারা দেশ থেকে প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় এসেছেন।
পরীক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে যখন তাঁদের ওএমআর শিট দেওয়া হয়, তখনই হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান যে অনিবার্য কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরীক্ষা না হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীদের যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার পেছনে খরচ করা অর্থ এবং সময় পুরোটাই বিফলে গেছে। যশোরের এম এম কলেজ থেকে আসা ফরিয়া ফেরদৌসসহ অনেক পরীক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা অনেক কষ্ট করে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তের এমন ঘোষণায় তাঁরা হতবাক। তিনি জানান, অনেক কষ্টে সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, চাকরিপ্রার্থীদের এই ভোগান্তির কি কোনো মূল্য নেই।
পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুক্রবার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তথ্য ও নমুনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁদের দাবি, প্রশাসন যদি এই অভিযোগ আগে থেকেই যাচাই করে ব্যবস্থা নিত, তবে তাঁদের এতটা ভোগান্তি পোহাতে হতো না। কেন্দ্র থেকে বের হয়ে ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়ক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের প্রতিবাদ জানান।
এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে প্রকৃত প্রশ্নপত্রের আংশিক মিল পাওয়া গিয়েছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতেই পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাজহারুল হক জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হবে। তবে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।
এই নিয়োগ পরীক্ষাটি ছিল ১১তম গ্রেডের। ২৪২টি পদের জন্য প্রায় তিন লাখ প্রার্থী আবেদন করায় প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ২৪০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। চাকরিপ্রার্থীরা জানিয়েছেন, একটি নিয়োগ পরীক্ষার জন্য তাঁরা দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রস্তুতি নেন। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগের কারণে এই প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, যার ফলে মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ছুটির দিন শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোয় ছিল বাড়তি ভিড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগারগাঁও, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো।
ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীরা এখন সরকার ও কর্তৃপক্ষের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কেবল পরীক্ষা বাতিল করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পরীক্ষার্থীদের ভাষ্য, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দিলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চান পরীক্ষার্থীরা।
নতুন তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের যাতায়াত ও আবাসনের খরচ বিবেচনা করে সরকারিভাবে কোনো প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এখন সবার দৃষ্টি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দিকে।






