রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার বাসিন্দা ও রিকশাচালক মো. আলমগীরের প্রতিদিনের সঙ্গী ১২ ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি। শারীরিক শক্তি ধরে রাখতে সারা দিনে তাঁকে তিন-চারবার নাশতা করতে হয়, যার বড় অংশজুড়ে থাকে একটি বনরুটি ও এক কাপ দুধ চা। এতদিন এই নাশতার জন্য তাঁর খরচ হতো ২০ টাকা—১০ টাকা বনরুটির জন্য আর ১০ টাকা চায়ের জন্য। তবে গত রবিবার থেকে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকায়, কারণ বাজারে বনরুটির দাম পিসপ্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মজীবী আলমগীরের কণ্ঠে তাই হতাশা, বাড়তি এই ৫ টাকা খরচ করা এখন তাঁর জন্য বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার ও খিলগাঁওসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এখন খোলা পাউরুটি বা বনরুটি ও কেকের দাম বাড়তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোথাও দাম বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের আকার বা ওজন কমিয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৭ হাজার ছোট বেকারি রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ৭০০টির বেশি। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সমিতি গত শনিবার থেকে সারা দেশে বেকারি পণ্যের দাম ও ওজন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে বেকারি মালিকরা জানাচ্ছেন, গত দেড়-দুই বছর ধরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল ও গ্যাসের মতো জরুরি উপকরণের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত ছয় মাসের ব্যবধানে খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকটে বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ গত এক বছরে ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ বিপরীতে উৎপাদন কমেছে ১০-১৫ শতাংশ হারে।
বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উৎপাদন খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। রুটি ও কেক তৈরির উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় ধরনের চাপে পড়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দাম বাড়ানোর দাবিতে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেকারিগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। এরপর নতুন দাম নির্ধারণ করে শনিবার থেকে আবারও পণ্য সরবরাহ শুরু হয়।
বাজারে বর্তমানে বিস্কুটের দাম কেজিতে গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে; আগে যেসব সাধারণ মানের বিস্কুট ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, তা এখন ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে, বনরুটি ও মাফিন কেকের ক্ষেত্রে দামের পাশাপাশি ওজনও কমিয়ে আনা হয়েছে। যেসব রুটির ওজন আগে ৪০ গ্রাম ছিল, দাম ঠিক রেখে তা কমিয়ে ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দাম ১০ বা ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে, তবে সেগুলোতে আকার সামান্য বড় রাখা হয়েছে।
বেকারি পণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চা বিক্রেতাদের ব্যবসায়ও। মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ জানান, চা পাতা ও চিনির দাম আগে থেকেই বেশি ছিল, এখন রুটি-কেকের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা তাঁর বেচাকেনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উল্লেখ্য, ঢাকার বাইরে খুলনা, চট্টগ্রাম, সাভার ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় রবিবার পর্যন্ত আগের দামেই বেকারি পণ্য বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, অর্থাৎ সব জায়গায় দাম বৃদ্ধির প্রভাব এখনো সমানভাবে পড়েনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় মাছ, মাংস, সবজি ও তেলের চড়া দামের সাথে বেকারিপণ্যের নতুন এই বাড়তি ব্যয় নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সকাল-বিকেল মিলিয়ে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পায়ে টানা রিকশা চালান তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কারণে তাঁরাও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দাম বাড়িয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রিকশাচালক আলমগীর বলেন, ‘দুইডা খেপ (ভাড়া) মাইরা একটা রুটি, একটা চা খাওনই লাগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ বলেন, ‘গত এক মাসে চা পাতার দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনিতে চায়ের দাম তো আমরা বাড়াতে পারিনি।






