বাংলা সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি, প্লেব্যাক সম্রাজ্ঞী সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন আজ। দীর্ঘ সংগীতজীবনে মায়াময় কণ্ঠ ও গায়কির জাদুতে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কেউ তাকে ডাকেন কোকিলকণ্ঠী বলে, কেউবা মিষ্টি গায়িকা। তবে এসব অভিধাকে ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সংগীতের এক অনন্য বাতিঘর। বিশেষ এই দিনে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা।
সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কনকচাঁপা বলেন, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ একবার একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করেছিলেন, কোকিল কবে গায়? তখন দর্শক উত্তর দিয়েছিল বসন্তে। এরপর তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, সারাবছর সুরে মাতিয়ে রাখে কোন পাখি? দর্শক উত্তর দিতে দেরি করায় তিনি নিজেই বলেছিলেন, সারাবছর গানে মাতিয়ে রাখা সেই পাখিটি আমাদের সাবিনা ইয়াসমিন। কনকচাঁপা যোগ করেন, সেই কথাটি অনেক বছর আগের। এখন আমি বলব, তিনি শুধু সারাবছর নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষকে সারাজীবন গানে ডুবিয়ে, ভাসিয়ে ও উজ্জীবিত করে রেখেছেন।
সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠের মাধুর্য ও দীর্ঘ সংগীতজীবনে তা অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন কনকচাঁপা। তিনি বলেন, সাবিনা আপা কোকিলের মতো গায় নাকি কোকিল তার মতো গায়, তা গবেষণার বিষয় না হলেও, পরিণত বয়সেও তিনি কীভাবে একই রকম কণ্ঠ ধরে রেখেছেন, তা অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে। কনকচাঁপা আরও বলেন, বাংলাদেশের গানের সব শাখায় সমান দক্ষতার সঙ্গে বিচরণ করার পরও একটি কথা না বললেই নয়—তিনি যদি ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ এবং ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’—এই তিনটি গান ছাড়া আর একটিও গান না গাইতেন, তবুও তিনি আজ যেমন মধুকণ্ঠী কোকিল হিসেবে সমাদৃত, ঠিক তেমনই থাকতেন।
জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমিনের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে কনকচাঁপা প্রার্থনা করেন, আজকের দিনটি একান্তই তার হয়ে যাক। তিনি বলেন, আজকের সব ফুল সাবিনা আপার জন্য ফুটুক। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ, আনন্দিত ও সুরক্ষিত রাখেন। শুভজীবন বাংলা গানের পাখি সাবিনা ইয়াসমিন।
সাবিনা ইয়াসমিনের সংগীতযাত্রার শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১৩ বছর বয়সে। ১৯৬৭ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে আলতাফ মাহমুদের সংগীত পরিচালনায় প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। সেই থেকে শুরু হওয়া পথচলায় তিনি দেশাত্মবোধক গানে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার গাওয়া কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের তালিকায় রয়েছে ‘ও আমার বাংলা তোর’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’ এবং ‘যদি মরণের পরে কেউ প্রশ্ন করে’-এর মতো অসংখ্য গান।
চলচ্চিত্র ও আধুনিক বাংলা গানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ১০ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। তার জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে ‘এ কী সোনার আলোয়’, ‘প্রেম যেন এক গোধূলি বেলার’, ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে’, ‘মন যদি ভেঙে যায় যাক’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’ এবং ‘এ সুখের নেই কোনো ঠিকানা’।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া চলচ্চিত্রের গানে অনন্য অবদানের জন্য তিনি রেকর্ড ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। দীর্ঘ সংগীতজীবন ও অসংখ্য কালজয়ী গানের মাধ্যমে সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছেন।






