
চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিকস সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রথম দিনেই অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। লেনদেনের শুরুতেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঘটনাকে চীনের রোবটশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটকে অনেক সময় চীনের ‘ন্যাসডাক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রোবোস্ট্র্যাটেজির জ্যাক পিয়ারসনের মতে, ইউনিট্রির এই তালিকাভুক্তি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মানবাকৃতি রোবট নির্মাণকারী খাতে বিনিয়োগের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। পিয়ারসন মনে করেন, ইউনিট্রির এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে চীনের রোবটশিল্প ‘পরিবর্তনের পর্যায়ে’ পৌঁছেছে এবং এটি অন্যদের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার পর্যন্ত রোবটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখন টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো বড় কোম্পানিগুলো মানুষের মতো দেখতে ও দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম রোবট তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
একসময় যে রোবট কেবল সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের ঘরে সাহায্যকারী হিসেবে রোবটের উপস্থিতি এখন আর কল্পনা নয়। তবে এ বিষয়ে সংশয়ও রয়েছে। রোবট বিশেষজ্ঞ হ্যারল্ড সো মনে করেন, ঘরের কাজে কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপযোগী পর্যায়ে পৌঁছাতে রোবট প্রযুক্তির আরও কয়েক বছর সময় প্রয়োজন। এর জন্য ব্যাটারির স্থায়িত্ব বাড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। তার মতে, শুরুতে কারখানা ও হাসপাতালের মতো বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই রোবটের বড় বাজার তৈরি হবে।
এ বছরের জুলাই মাসে ইউবিটেক নামের আরেকটি চীনা কোম্পানি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত রোবট উন্মোচন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এসব রোবট মানুষের সঙ্গে আবেগপ্রবণ সহায়তা ও দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। তবে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় দেশই এই শিল্পকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন গত জুলাই মাসে জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন উৎপাদন খাত সুরক্ষার অজুহাতে চীনে নির্মিত নতুন মানবাকৃতি ও চার পায়ের রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। বেইজিং অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের দাবি, ওয়াশিংটন বাণিজ্যিক বিষয়কে অহেতুক ‘রাজনৈতিকীকরণ’ করছে। এর আগে এআই মডেল ও বৈদ্যুতিক গাড়িসহ অন্যান্য চীনা প্রযুক্তির ওপরও যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের ক্রিস্টিন ওয়ান মনে করেন, রোবটশিল্পে চীনের আধিপত্যের বিষয়টি বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে তাদের গভীর সংযোগকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, চীনা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে অনেক দেশের উৎপাদনব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে অনেক দেশই সহজে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইবে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোও পিছিয়ে নেই। বোস্টন ডায়নামিকস জানিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুন্দাইয়ের কারখানায় তাদের মানবাকৃতি রোবট ব্যবহার শুরু হবে। উল্লেখ্য, বোস্টন ডায়নামিকসের সিংহভাগ মালিকানা দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাইয়ের হাতে। এছাড়া অ্যামাজন ও টেসলার মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোও মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইলন মাস্কের টেসলা জানিয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের মডেল এস ও মডেল এক্স গাড়ি তৈরির কারখানায় ‘অপ্টিমাস’ নামের রোবট ব্যবহার করা হবে। অ্যামাজনও ২০২৩ সালে তাদের গুদামে মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে।
তবে রোবট-গবেষক ডেভিড সুর মতে, প্রযুক্তিগত এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের রোবট কোম্পানিগুলোর চেয়ে চীনের কোম্পানিগুলোর খবরই বেশি শোনা যায় এবং খবরের শিরোনামে তাদেরই আধিপত্য। ডেভিড সুর ভাষায়, প্রযুক্তির দুনিয়ায় তারাই এখন আমেরিকার জায়গা দখল করে নিয়েছে।
এখন পর্যন্ত কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা কিংবা ভোক্তা বাজারে পশ্চিমাদের তৈরি রোবট চীনা রোবটের মতো তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে এই শিল্পে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারের সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০