রাওয়ালপিন্ডিতে গতকাল ইংল্যান্ডের ৪২৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয় ক্রিকেট বিশ্বে নতুন করে চার শ রানের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১৯৯৬ বিশ্বকাপে একই ভেন্যুতে গ্যারি কারস্টেন অপরাজিত ১৮৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন। সেই টুর্নামেন্টেই কেনিয়ার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার ৫ উইকেটে ৩৯৮ রান করার পর থেকেই ওয়ানডেতে চার শ রানের মাইলফলক অর্জনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ধারা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত ৩৫ বার কোনো দল দলীয় চার শ রানের কোটা অতিক্রম করেছে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে এই রাওয়ালপিন্ডিতেই আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১৮৮* রানের ইনিংস খেলেছিলেন প্রোটিয়া কিংবদন্তি। আর শ্রীলঙ্কাও সেই বিশ্বকাপে কেনিয়ার বিপক্ষে ৫ উইকেটে ৩৯৮ তুলে বুঝিয়ে দিয়েছিল ওয়ানডেতে দলীয় ৪০০ রানের হিমালয়ে ওঠা আর স্বপ্ন নয়। ২০০৬ সালে চার শ রানের ধারা সেই যে শুরু হলো, সময়ের পালাবদলে গতকাল রাতে ইংল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কা সেই তালিকাটাই হালনাগাদ করল।
পরিসংখ্যান বলছে, এই তালিকায় সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারত, যারা এখন পর্যন্ত ৯ বার চার শ বা তার বেশি রান করেছে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ড আটবার করে, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া তিনবার করে, নিউজিল্যান্ড দুবার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ে একবার করে এই কীর্তি গড়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, টেস্ট মর্যাদা পাওয়া ১২টি দেশের মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড আজও ওয়ানডে ক্রিকেটে দলীয় চার শ রানের দেখা পায়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৩৪৯ রান সংগ্রহ করেছে ২০২৩ সালে, সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। সর্বোচ্চ ৯ ইনিংসে চার শ রান করেছে। জিম্বাবুয়ে তো এখনো বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই না। এই তো কদিন আগেও আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখনও এই মাইলফলক স্পর্শ করতে না পারলেও, ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অবশ্য চার শ রানের দেখা মিলেছে। গত জুন মাসে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব আবাহনীর বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৪০৬ রান সংগ্রহ করেছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে এইচপি দল টাইগার্সের বিপক্ষে ৫ উইকেটে ৪০৩ রান তুলেছিল। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্তত চার শ রানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রসারের সাথে সাথে ওয়ানডেতে বড় রান তাড়া করে জেতার প্রবণতাও বেড়েছে। গত বছর ডিসেম্বর থেকে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে চার শ রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা ঘটেছে চারটি। এর মধ্যে রাওয়ালপিন্ডিতে ইংল্যান্ডের ৪২৯ রান তাড়া করে শ্রীলঙ্কার জয়টি অন্যতম। ওয়ানডেতে রান তাড়ায় জয়ের বিশ্বরেকর্ড অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার দখলে; ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে তারা অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রান টপকে জয় পেয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডির এই জয়ের ফলে শ্রীলঙ্কা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এর আগে ২০০৯ সালে তারা ভারতের বিপক্ষে ৪১১ রান তাড়া করে জিতেছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে শ্রীলঙ্কা দলের ড্রেসিংরুমে গ্যারি কারস্টেনকে দেখে একটি স্মৃতি মনে পড়তে পারে। শেষ নামটি দেখে কি একটু আক্ষেপ জাগে। ১১৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি, ৪২৯ রান তাড়া—রাওয়ালপিন্ডিতে রেকর্ডের পর রেকর্ড।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া দুই সংস্করণ মিলিয়েই গত বছর ডিসেম্বর থেকে চার শ রান তাড়া করে জয়ের চারটি ম্যাচ হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের বিজয় হাজারে ট্রফিতে গত ২৪ ডিসেম্বর কর্ণাটক ৪১২ রান তাড়া করে জেতে ঝাড়খন্ডের বিপক্ষে। অন্যদিকে গত জুলাইয়ে ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের ইন্টার-প্রভিন্সিয়াল লিমিটেড ওভার কাপে নর্দান নাইটসের ৪১৪ রান তাড়া করে জয়ের নজির গড়েছে লেনেস্টের লাইটনিং।
ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ডটি ইংল্যান্ডের দখলে, যারা ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪৯৮ রান করেছিল। এছাড়া ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে পাঁচ শ রানের মাইলফলকও অতিক্রান্ত হয়েছে। ভারতের বিজয় হাজারে ট্রফিতে ২০২২ সালে তামিলনাড়ু অরুণাচলের বিপক্ষে ২ উইকেটে ৫০৬ রান এবং গত বছর ডিসেম্বরে বিহার একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৬ উইকেটে ৫৭৪ রান তুলে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। ওয়ানডে ক্রিকেটের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশ এখনও কাঙ্ক্ষিত সেই চার শ রানের দুয়ারে পৌঁছাতে পারেনি।






