কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি বাড়ার সুবাদে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি এসেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি এআইয়ের প্রসারে দ্রুত বাড়ছে।
চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ফলাফল বিশ্লেষকদের অনেকের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। সোমবার চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্যে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। এর আগে দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ২০২৬ সালের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময়কালটি বাদ দিলে, এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির অন্যতম ধীর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে চীনের রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এই সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ২৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য। মূলত সেমিকন্ডাক্টরসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের শক্তিশালী চাহিদাই এই অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
রপ্তানি খাতে দারুণ সাফল্য সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগের গতি এখনো সেভাবে বাড়েনি। সেপ্টেম্বরে খুচরা বিক্রির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খুচরা বিক্রির মোট প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া উৎপাদন শিল্প বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। সেপ্টেম্বরে শিল্প উৎপাদনের সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রথম তিন প্রান্তিকে এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে।
তবে আবাসন ও স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সেপ্টেম্বরে স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ সামান্য বাড়লেও, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে এ খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ সংকোচন দেখা গেছে। আবাসন খাত এখনো সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ঝিগুও হে মনে করেন, চীন সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেইজিং সুপরিকল্পিতভাবেই প্রবৃদ্ধির গতি ধীর রাখছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ইতিবাচক। আবাসন, কারখানা ও যন্ত্রপাতিতে ব্যয়কে এ বিনিয়োগের আওতায় ধরা হয়। সেপ্টেম্বরে এ খাতে বিনিয়োগ সামান্য বেড়ে ০ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে তা ৭ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
অধ্যাপক ঝিগুও হে আরও উল্লেখ করেন, আবাসন খাত সংকুচিত হওয়া বেইজিংয়ের কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ, যা চীনের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতির জন্য ভালো দিক। তিনি মনে করেন, চীনের সাধারণ পরিবারগুলোও ধীরে ধীরে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে তাদের প্রত্যাশাকে মানিয়ে নিচ্ছে। যদিও রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতা রয়েছে, তবুও বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে পারা চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারই প্রমাণ দেয়। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা ও আবাসন খাতের মন্দা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাপে রেখেছে।






