গরুর মাংসের রাজনীতি ও সহনশীলতার সংকট

প্রকাশ:
Print news

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী মন্দিরের সন্নিকটে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্না নিয়ে সম্প্রতি বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, স্নাতক শেষ করা উপলক্ষে এই আয়োজন ছিল নিছকই একটি ভোজ। তবে মন্দিরের ইট ব্যবহার করে চুলা তৈরি ও মন্দিরের কাছে রান্নার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠলে আয়োজকেরা দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ইট সরিয়ে নেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলোচনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটি এখানেই থমকে থাকেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ কথাটিই সার্থক করে তুলল। আবার মন্দিরের কাছে রান্না নিয়ে আপত্তি জানালেই কেউ অন্যের খাবার খাওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চান, এমনটা বলা যায় না। আপত্তির কারণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা নিতে হবে। যাঁরা শুরুতে রান্না করেছিলেন, তাঁরা ভুল বুঝে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট ও সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা। ক্যাম্পাসে কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে, উপাসনাস্থলের পরিবেশ কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেত।

প্রশাসনের সমঝোতা সত্ত্বেও বিষয়টিকে ‘গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার’ প্রতিষ্ঠার একটি আন্দোলনে রূপ দেওয়া হয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) এর প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে পশু জবাই ও ভোজের ঘোষণা দেয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জনস্বার্থ ও পরিচ্ছন্নতার কথা বলে পশু জবাই না করার নির্দেশনা দিয়েছিল, কিন্তু চাপের মুখে প্রশাসন অবস্থান বদলে সেই কর্মসূচির অনুমতি দেয়। শুক্রবার সেই কর্মসূচি পালিত হয় এবং পরদিন বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পুনরায় আরেকটি গরু জবাই, ভোজ ও কাওয়ালি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। প্রক্টরের ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে শর্ত সাপেক্ষে সেই দ্বিতীয় আয়োজনটিরও অনুমতি দিতে হয়েছে প্রশাসনকে। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক চাপ বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। তারপর রাজনৈতিক নেতার ফোনে মিলল আরেক আয়োজনের অনুমতি। পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন সাম্প্রদায়িক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। কেউ গরুর মাংস খান বলেই তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যান না।

ক্যাম্পাসের এই ঘটনাগুলোকে নিছক খাবার বা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ‘জিয়াফত’ নামে গরু জবাইয়ের কর্মসূচিগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক আবহে দেখা গেছে। এর আগে নভেম্বরে কার্যালয়ের সামনে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘জুলাই জিয়াফত’ নাম দিয়ে একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এই প্রতিটি আয়োজনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য যেন প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করা এবং রাজনৈতিক আধিপত্য প্রদর্শন। খাবার এখানে একটি উপলক্ষ মাত্র; আসল লক্ষ্য হলো ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়ে বিভাজন তৈরি করা এবং নিজেদের শক্তি জানান দেওয়া। সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো বা প্রতিবাদের বদলে গরু জবাইকে সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করা হয়। কিন্তু প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে উত্তেজনার মধ্যে গরু জবাইকে রাজনৈতিক প্রতীক বানানোর প্রবণতাকে নিছক খাওয়াদাওয়া বা নিরীহ প্রতিবাদ বলার সুযোগও নেই।

ভারতের ‘গোরক্ষক’ গোষ্ঠী যেমন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সংঘাত তৈরি করে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু গোষ্ঠীর প্রকাশ্যে গরু জবাইয়ের রাজনীতি তার উল্টো পিঠ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ভারতে প্রবীণ বাম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সংখ্যালঘু মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়েছিলেন, যা ছিল একটি প্রতিবাদী ও প্রথাবিরোধী পদক্ষেপ। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের খাদ্যতালিকায় গরুর মাংস প্রধান স্থান দখল করে আছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থালিতেও কোনো বাধা ছাড়াই এর ব্যবহার চলে। এখানে সহনশীলতার যে সংস্কৃতি ছিল, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিপন্ন করা হচ্ছে। বিভাজনের রাজনীতি থেকে মানুষ মুখ ফেরাচ্ছে। কয়েক বছর আগে কলকাতায় প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ বামপন্থী নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। বাজারে-সুপার শপে দেদার গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে কোথাও কোনো বাধা নেই; অল্প যেটুকু সংবেদনশীলতা আছে, সেটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি একধরনের সম্মান বা সহনশীলতা থেকে তৈরি হয়েছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে ‘বিপন্ন অধিকার’ হিসেবে হাজির করছে। কাজের ধরন বিপরীত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সংখ্যালঘুকে চাপে রাখার রাজনৈতিক কৌশলে দারুণ মিল দেখা যাচ্ছে। কেউ যদি ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির সত্যিকারের বিরোধী হন, তাহলে তাঁকে বাংলাদেশে একই ধরনের রাজনীতিরও বিরোধিতা করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়া, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময় গরু জবাইয়ের মতো বিচ্ছিন্ন কিন্তু উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও অসহিষ্ণুতার চিত্র তুলে ধরছে। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ মনে করা ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু সেই বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষের মর্যাদা ও সমান অধিকার খর্ব করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষের বিরোধী হলে, একইভাবে এদেশের উগ্রপন্থা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। নিজেদের সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘুদের অধিকারের দাবি তোলা এক ধরনের স্ববিরোধী ও অসৎ রাজনৈতিক অবস্থান।

বর্তমানে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক মূল্যবোধ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সহাবস্থানের যে সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের ছিল, তা আজ দারুণভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইচ্ছায় ক্যাম্পাস বা সমাজ চলবে—এই মানসিকতা বন্ধ করতে না পারলে অস্থিতিশীলতা ও অসহিষ্ণুতা আরও প্রকট হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে বুঝতে হবে, অস্পষ্ট নির্দেশনা ও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার কোনো সমাধান নয়, বরং এটি ভুল বার্তা দেয় যা দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত উসকে দেয়। প্রশ্নটি তখন খাবারের মধ্যে থাকে না; কার ইচ্ছায় ক্যাম্পাস চলবে, সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। মনজুরুল ইসলাম জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক *মতামত লেখকের নিজস্ব।

শেয়ার করুন
শিরোনাম :
আইডিআরএ: বীমা দাবির টাকা দিয়ে নতুন পলিসি নিতে বাধ্য আবাহনীর টানা দ্বিতীয় জয়, পয়েন্ট হারাল বাংলাদেশ পুলিশ ঢাবিতে ১০৭ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর হাতে সাদা ছড়ি তুলে দেওয়া গরুর মাংসের রাজনীতি ও সহনশীলতার সংকট ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: রাষ্ট্রপতি জামিনে মুক্ত ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সৌদিতে হুথি হামলার নিন্দা ও শিশুদের সুরক্ষায় কাতার মন্ত্রিসভার পুরো ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন লিটন দাস এনবিআর: বিদেশি পণ্য আমদানিতে কয়েক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অনুশীলনের সময় হ্যান্ডবল কোচদের দুটি আইফোন সম্পদ সংক্রান্ত ঘটনায় নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে ১৮ পদে নিয়োগ: আবেদনের সময়সীমা বাড়ল সংগীতে ৫০ বছর: টরন্টোয় বিশেষ আয়োজনে তপন চৌধুরী রায়েরবাজারের শতবর্ষী গদিঘর: ইতিহাস ও সম্প্রীতির এক নীরব সাক্ষী শিশু হাসপাতালে ধূমপান: চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আংশিক কার্যকর করলেন ট্রাম্প শান্তিরক্ষীদের ওপর ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানালো কাতার পূজার স্মৃতিতে অমলিন বাংলা গানের সেই সোনালি সুর সাজেকের সংকট নিরসনে আলোচনা চলছে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল ম্যানচেস্টার সিটির আইনি সংকট আইডিআরএ: বীমা দাবির টাকা দিয়ে নতুন পলিসি নিতে বাধ্য আবাহনীর টানা দ্বিতীয় জয়, পয়েন্ট হারাল বাংলাদেশ পুলিশ ঢাবিতে ১০৭ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর হাতে সাদা ছড়ি তুলে দেওয়া গরুর মাংসের রাজনীতি ও সহনশীলতার সংকট ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: রাষ্ট্রপতি জামিনে মুক্ত ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সৌদিতে হুথি হামলার নিন্দা ও শিশুদের সুরক্ষায় কাতার মন্ত্রিসভার পুরো ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন লিটন দাস এনবিআর: বিদেশি পণ্য আমদানিতে কয়েক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অনুশীলনের সময় হ্যান্ডবল কোচদের দুটি আইফোন সম্পদ সংক্রান্ত ঘটনায় নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে ১৮ পদে নিয়োগ: আবেদনের সময়সীমা বাড়ল সংগীতে ৫০ বছর: টরন্টোয় বিশেষ আয়োজনে তপন চৌধুরী রায়েরবাজারের শতবর্ষী গদিঘর: ইতিহাস ও সম্প্রীতির এক নীরব সাক্ষী শিশু হাসপাতালে ধূমপান: চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আংশিক কার্যকর করলেন ট্রাম্প শান্তিরক্ষীদের ওপর ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানালো কাতার পূজার স্মৃতিতে অমলিন বাংলা গানের সেই সোনালি সুর সাজেকের সংকট নিরসনে আলোচনা চলছে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল ম্যানচেস্টার সিটির আইনি সংকট