বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার দীর্ঘ দিন ধরে গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকায় বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী গন্তব্যগুলোতে কর্মী যাওয়ার হার হয় কমেছে, নয়তো বাজারগুলো বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র নতুন নতুন দেশের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কর্মী। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। এই নিম্নমুখী প্রবণতা অভিবাসন খাতে অস্থিরতারই প্রতিফলন।
শ্রমবাজারের এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে রাশিয়ায় পাঠানো কর্মীদের অভিজ্ঞতায়। লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমকে সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজ দেওয়ার কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে সরাসরি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। জাহাঙ্গীর জানান, শুরুতে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। ১৬ জনের একটি ক্যাম্পে সাত মাস কাটানোর পর বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় তিনি দেশে ফেরেন। ৩২ লাখ টাকা খুইয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও তাঁর মতো অনেকেই সেখানে আটকা পড়েছেন। ফোর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের তথ্যমতে, গত মার্চ পর্যন্ত রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশির মধ্যে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন।
একইভাবে কম্বোডিয়ার মতো দেশেও চাকরির নামে প্রতারণা চলছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন, যা দেশটিকে বাংলাদেশের অষ্টম বৃহত্তম শ্রমবাজারে পরিণত করেছে। অথচ সেখানে কলসেন্টারে চাকরির আড়ালে কর্মীদের দিয়ে অনলাইন প্রতারণা করানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপে সম্প্রতি এসব স্ক্যাম সেন্টারে অভিযান চালানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার কার্যত সংকুচিত। ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় এক লাখ কর্মী গেলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৫০ জনে নেমে এসেছে। মালয়েশিয়ার বাজারও অনিয়মের অভিযোগে গত বছরের জুনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের পর বাজারটি পুনরায় খোলার ঘোষণা এসেছে, তবে আগের সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো উদাসীনতা রয়ে গেছে। সরকারি ইশতেহারে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী মনে করেন, বন্ধ শ্রমবাজার চালু এবং নতুন বাজার তৈরির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার না করলে পাচার ও প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টাও থামছে না। লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। ২০২৫ সালে এই পথে ইতালি যাওয়ার সময় ৬৬ হাজার ৩১৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ১২৬ জন নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও ১৪ হাজার ১৯৪ জন একই পথে ইতালি গিয়েছেন।
মানব পাচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ৪ হাজার ৪২৭টি মামলা হলেও অভিযুক্তদের ৯৪-৯৫ শতাংশই খালাস পেয়ে গেছেন। সিআইডির তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫৩৬টি মামলায় ১ হাজার ৬৫৭ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩৫৩ জনকে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার খোঁজার বিষয়ে সরকার কাজ করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক কোটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সচেষ্ট। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। এই সংখ্যা কমিয়ে নজরদারি বাড়াতে না পারলে প্রতারণার চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১৫ হাজার ২৪৫ জন এবং শুধু এপ্রিলেই ৮ হাজার ২১৫ জন কর্মী ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন। পাসপোর্ট হারিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়ে দেশে ফেরা এসব কর্মীর করুণ পরিণতিই বলে দেয়, বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব কতটা প্রকট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁরা একসঙ্গে ১৬ জন ছিলেন যুদ্ধের ক্যাম্পে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চারজন মারা যাওয়ার পর তাঁর দিন কাটছিল আতঙ্কে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অসুস্থ হয়ে দুই মাস হাসপাতালে কাটান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকেরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর্থিক দিক দিয়ে বেশি সচ্ছলেরা যান ইউরোপের দেশগুলোতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুন মাসে মালয়েশিয়া সফর করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউরোপের দেশগুলোতেও যথেষ্টসংখ্যক কর্মী যেতে পারছে না।






