বাংলা সিনেমার ইতিহাসের পাতায় কিছু জুটি কেবল সাফল্যের মাপকাঠিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে তারা হয়ে উঠেছে বাঙালির নস্টালজিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার আলোয় তাদের চোখের ভাষা, নীরব অভিমান কিংবা কাছে আসার ভঙ্গি আজও দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। উত্তম কুমারের অভিনয় জীবনে বহু নায়িকার সঙ্গে তার জুটি গড়ে উঠেছিল, যার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল—নায়িকা পরিবর্তনের সাথে সাথে উত্তমের অভিনয়শৈলী ও চরিত্রের রূপও বদলে যেত।
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তমের রসায়ন ছিল বাঙালির রোমান্টিক কল্পনার চূড়ান্ত রূপ। ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমার মাধ্যমে তাদের একসঙ্গে পথচলা শুরু হয়। যদিও ছবিটি হাস্যরসাত্মক ছিল, তবুও উত্তম-সুচিত্রার উপস্থিতি দর্শকদের মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছিল। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাগরিকা’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘বিপাশা’ ও ‘গৃহদাহ’-এর মতো সিনেমায় তাদের সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা ফুটে উঠেছে। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় কৃষ্ণেন্দু ও রিনা ব্রাউনের প্রেম আজও অমলিন।
সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তমের সম্পর্ক ছিল বাস্তবের অনেক কাছাকাছি। তাদের অভিনীত ‘সোনার হরিণ’, ‘উত্তর মেঘ’, ‘শুন বরনারী’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘দুই পুরুষ’ ও ‘বনপলাশীর পদাবলী’র মতো সিনেমাগুলোতে উত্তমের মধ্যে এক ধরনের সংসারী পুরুষের দ্বন্দ্ব, অপরাধবোধ ও দুর্বলতা ফুটে উঠত। পর্দার বাইরের বাস্তব সম্পর্কের ছায়া যেন তাদের অভিনয়ের রসায়নকে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল।
উত্তম ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জুটি ছিল অনেকটা ঘরোয়া ও সাবলীল। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘মৌচাক’ ও ‘ধন্যি মেয়ে’-এর মতো সিনেমায় তাদের রসায়নে প্রেমের পাশাপাশি হাসির এক চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যেত। অন্যদিকে, মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তমের রসায়ন ছিল অনেক বেশি সংযত ও আধুনিক। ‘থানা থেকে আসছি’, ‘শঙ্খবেলা’, ‘অগ্নীশ্বর’ ও ‘ছদ্মবেশী’ সিনেমায় তাদের অভিনয়ে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। মাধবীর বুদ্ধিদীপ্ত সংযমের পাশে উত্তমকে এক আধুনিক সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দেখা যেত।
মাধবী মুখোপাধ্যায় নিজেও উত্তমের অভিনয়ের একটি বিশেষ গুণের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “উত্তমের ‘অ্যাকশন-রিঅ্যাকশন’ কখনো ভুল হতো না।” বিশেষ করে ‘শঙ্খবেলা’ সিনেমার সাফল্য এই জুটির রসায়নের এক বড় উদাহরণ হয়ে আছে।
সম্পর্কের জটিলতা ও বিচ্ছেদের সুর নিয়ে অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গে উত্তমের ‘জতুগৃহ’ সিনেমাটি এক অনন্য সৃষ্টি। তপন সিংহের এই সিনেমায় শতদল ও মাধুরীর দাম্পত্য জীবনের বাইরের সফলতার আড়ালে জমে থাকা অপূর্ণতা ও বেদনার গল্প ফুটে উঠেছে।
সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমা ‘নায়ক’-এ উত্তম কুমার ও শর্মিলা ঠাকুরের রসায়ন ছিল অন্যরকম। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমায় উত্তম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা অরিন্দম মুখার্জির ভূমিকায় এবং শর্মিলা সাংবাদিক অদিতির চরিত্রে অভিনয় করেন। এখানে প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল সংলাপ, প্রশ্ন এবং তারকার আড়ালের মানুষটির অসহায়ত্ব।
মালা সিনহার সঙ্গে উত্তমের জুটি হয়তো সর্বজনীন প্রতীকে পরিণত হয়নি, কিন্তু তাদের একসঙ্গে কাজের সংখ্যা ছিল অনেক। ‘পুত্রবধূ’, ‘সুরের পরশে’, ‘পৃথিবী আমারে চায়’, ‘বন্ধু’, ‘খেলাঘর’, ‘শহরের ইতিকথা’ ও ‘সাথীহারা’-এর মতো সিনেমায় এক নায়ককে বহু আবেগের ভিন্ন ভিন্ন মুখে দেখা গেছে।
তনুজার সঙ্গে উত্তমের জুটি ছিল তারুণ্যে ভরপুর। ‘দেয়া নেয়া’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘তিন ভুবনের পারে’, ‘প্রথম কদম ফুল’ ও ‘রাজকুমারী’ সিনেমায় তাদের প্রাণচাঞ্চল্য দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে ‘দেয়া নেয়া’ সিনেমায় তাদের রসায়ন আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
উত্তম কুমারের নায়িকাদের তালিকা আসলে তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের এক বিচিত্র আয়না। প্রতিটি নায়িকাই উত্তমের অভিনয়ের ভেতর দিয়ে নতুন নতুন জানালা খুলে দিয়েছিলেন। সুচিত্রার পাশে তিনি স্বপ্নমগ্ন প্রেমিক, আবার সাবিত্রীর পাশে ঘরোয়া মানুষ—এভাবেই তিনি বারবার নিজেকে ভেঙে গড়েছেন।
আজকের দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় বা মুঠোফোনের ফ্রেমে যখন সেই পুরনো সিনেমাগুলো দেখেন, তখন মাধ্যম বদলালেও প্রেমের আবেদন একই রয়ে যায়। প্রযুক্তি ও সময় পাল্টালেও উত্তমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি নায়িকা তার অভিনয়ের রঙ বদলে দিয়েছেন, আর সেই প্রতিটি রূপেই মহানায়ক নতুন করে ফিরে এসেছেন দর্শকদের মাঝে।
পরিশেষে বলা যায়, উত্তমের নায়িকারা কেবল সহশিল্পী ছিলেন না, তারা ছিলেন মহানায়কের অভিনয়ের একেকটি পরিপূরক। তাদের সঙ্গে প্রতিটি জুটিতেই উত্তম কুমার এক নতুন সম্পর্কের রূপকথা তৈরি করে গেছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই উত্তম কুমারকে বুঝতে গেলে শুধু মহানায়ককে দেখলেই হয় না; দেখতে হয় তার পাশে দাঁড়ানো নারীদেরও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ তাদের চোখে চোখ রেখেই পর্দায় বারবার নতুন করে জন্ম নিয়েছিলেন উত্তম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উত্তম কুমারের নামের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, দুজনকে আলাদা করে ভাবাই কঠিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরের বছর ‘অগ্নিপরীক্ষা’ এসে সেই সম্ভাবনাকে পরিণত করে এক নতুন রোমান্টিক যুগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও প্রেম সহজ, কোথাও অসম্ভব; কোথাও কাছে আসার আনন্দ, কোথাও দূরে সরে যাওয়ার যন্ত্রণা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চোখের দৃষ্টি, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা—এসব দিয়েই তারা এমন আবেগ তৈরি করতেন, যা আজকের দ্রুতগতির সিনেমাতেও সহজ নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে মানুষটি প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি নিয়ে ‘হারানো সুর’ দেখেন, কিংবা সম্পর্কের অসম্ভবতা নিয়ে ‘সপ্তপদী’ দেখেন, তিনি নিজেরই কোনো না কোনো অনুভূতির ছায়া সেখানে খুঁজে পান।






