
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার পারাইরচক এলাকায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালটি এখন তার মূল উদ্দেশ্য থেকে ছিটকে পড়েছে। ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর শুরু হওয়া এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর। ৮ একর ৭৭ শতক জমির ওপর গড়ে তোলা এই টার্মিনালে ট্রাক চালকদের বিশ্রামাগারসহ দোতলা ভবন ও নান্দনিক অবকাঠামো রয়েছে। ৪৫০টি ট্রাক একসঙ্গে রাখার মতো জায়গা থাকলেও বাস্তবে সেখানে ট্রাকের দেখা মেলে না বললেই চলে। এ অর্থের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, চালকদের বিশ্রামের জন্য দোতলা ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরে ট্রাক রাখার বদলে চলছে ক্রিকেট খেলা। অস্থায়ী ক্রিজে ব্যাটিং-বোলিং চলছে, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছেন প্রায় ২০ জন তরুণ ও যুবক। ব্যাটসম্যান চার-ছক্কা হাঁকালে দর্শকরা উল্লাস করছেন, আবার আউট হলে শোনা যাচ্ছে হর্ষধ্বনি। টার্মিনালের মাঠের একদিকে কিছু মানুষ ঘোরাফেরা করছেন, আবার আড়ালে গিয়ে অনেকের প্রস্রাব করার মতো অস্বাস্থ্যকর দৃশ্যও চোখে পড়েছে। অথচ এটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি ট্রাক টার্মিনাল হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। ব্যাটসম্যানের হাঁকানো চার-ছক্কায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন তাঁরা। কেউ কেউ কিছুটা আড়ালে গিয়ে প্রস্রাবও করছিলেন।
সেখানে পার্ক করা একটি ট্রাকের চালক মো. লায়েক জানান, তিনি টার্মিনালের পার্শ্ববর্তী এলাকার এক মালিকের ট্রাক চালান বলেই এখানে পার্ক করেন। তাঁর ভাষ্যমতে, টার্মিনালে নিয়মিত ১৩ থেকে ১৪টি ট্রাকের বেশি দেখা যায় না। নগর থেকে টার্মিনালটির দূরত্ব প্রায় ৮ থেকে ৯ কিলোমিটার হওয়া এবং আশপাশে হোটেল বা রেস্তোরাঁর অভাব থাকায় চালকরা সেখানে ট্রাক রাখতে আগ্রহী নন। টার্মিনালে ঢোকার মুখে ১৪টি ট্রাক পার্ক করা দেখা গেলেও ভেতরের বেশির ভাগ জায়গাই ফাঁকা।
সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায় আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তি টার্মিনালটি ইজারা নিয়েছেন। এর আগের বছরগুলোতে ইজারার পরিমাণ ছিল ভিন্ন; যেমন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেসার্স রাফা ট্রেডিং ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আনিকা ট্রেডিং ১৬ লাখ ১৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছিল। তবে ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কোনো দিন ১৩-১৪টি, আবার কোনো দিন ২০টি ট্রাক থাকে, যা থেকে লাভ করা কঠিন।
টার্মিনালে ট্রাক না আসার কারণে ইজারাদাররাও এখন লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। আগে নগরের কালীঘাট, কিনব্রিজ এলাকা ও সোবহানীঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক থেকে ইজারাদাররা চাঁদা তুলতে পারতেন, কিন্তু সিটি করপোরেশন সেই সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে শুধু টার্মিনালের ভেতরে ট্রাক রাখলেই টাকা নেওয়া যায়, ফলে ইজারা নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে, কর শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পবিত্র ঈদুল আজহার সময় ১০ দিনের জন্য টার্মিনালে অস্থায়ী পশুর হাট বসানো হয়, ওই সময় ট্রাক রাখার কোনো সুযোগ থাকে না। উইকেটরক্ষকসহ মাঠে ফিল্ডিং করছেন আরও ১০ জন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব জানান, টার্মিনালটি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় চালকরা সেখানে যেতে চান না। পাশাপাশি আগের মতো সড়কের ট্রাক থেকে ইজারার টাকা সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় ইজারাদাররাও বেশি অর্থ দিয়ে টার্মিনাল নিতে আগ্রহী নন।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে টার্মিনালটি কার্যকর না হওয়ার মূল কারণ এর অবস্থান। তিনি জানান, কীভাবে টার্মিনালটি সচল করা যায় সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভাবছে। স্থানীয় চালকদের অভিযোগ, নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ট্রাক পার্কিংয়ের কারণে তীব্র যানজট তৈরি হলেও এই টার্মিনাল তা কমাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। সব মিলিয়ে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও টার্মিনালটি এখন কার্যত একটি পরিত্যক্ত স্থাপনায় রূপ নিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০