
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের নদীবেষ্টিত জনপদে বেড়ে ওঠা আরিফ হোসেনের শিক্ষাজীবনের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষক-সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে নটর ডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আরিফ কঠোর পরিশ্রম করেন এবং সফলও হন। নটর ডেম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
আরিফের জীবনে সাহিত্যের প্রভাব ছিল গভীর। নবম শ্রেণিতে জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ পড়ে তাঁর মধ্যে বই পড়ার নেশা জাগে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের লেখা তাঁকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ বইটি পড়ার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের ফার্গো শহরের কথা জানতে পারেন। বইটিতে লেখকের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা ও তুষারপাতের বর্ণনা আরিফের মনে গভীর দাগ কাটে। তখন থেকেই ফার্গো এবং নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি তাঁর স্বপ্নের গন্তব্যে পরিণত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে আরিফ সরকারি চাকরির প্রস্তুতির দিকে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু হঠাৎ তীব্র পিঠের ব্যথা ও আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় তাঁর জীবন থমকে যায়। শারীরিক যন্ত্রণায় তিনি একটানা এক ঘণ্টাও বসে থাকতে পারতেন না। সেই সময়টিকে তিনি জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন। আরিফ বলেন, ‘ব্যথার কারণে যখন স্বাভাবিকভাবে বসতেই পারতাম না, তখন মনে হয়েছিল জীবনে আর কোনো স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই।’
চেন্নাই থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পর আরিফ কিছুটা সুস্থ বোধ করেন এবং ঢাকার একটি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আইইএলটিএস ও জিআরই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে তিনি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাগ্রিবিজনেস অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিকস বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। পূর্ণ টিউশন মওকুফ সুবিধাসহ ২০২৩ সালের ফল সেমিস্টারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আরিফ কেবল পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তিনি নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট কাউন্সিলের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৫ সালে সফলভাবে গবেষণাপত্রের প্রতিরক্ষা সম্পন্ন করে তিনি অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিকসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
মাস্টার্স শেষ হলেও আরিফের মূল লক্ষ্য ছিল পিএইচডি। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন পিএইচডি প্রোগ্রামটি প্রতি দুই বছর পরপর শিক্ষার্থী নেয়। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী নেওয়ায় পরবর্তী সুযোগ ছিল ২০২৬ সালে। কিন্তু এক বছর অপেক্ষা করলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ শিক্ষার্থী হিসেবে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। এই সংকট কাটাতে তিনি পরিসংখ্যানের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন, যা তাঁর গবেষণার জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালেই আরিফ ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন পিএইচডি প্রোগ্রামে আবেদন করেন। তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে এই প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ দেয়। এ মাসেই তাঁর পিএইচডির ক্লাস শুরু হচ্ছে। আরিফ বলেন, ‘অনেক সময় আমরা যে পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে চাই, সেই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন গন্তব্য পরিবর্তন না করে নতুন পথ খুঁজে নিতে হয়।’
আরিফের এই দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন সময়ে তিনি নানা সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স ফেলোশিপ, যেখানে বছরে ৯৮ হাজার ডলারের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটিতে বিনা খরচে ৬ সপ্তাহের গবেষণার সুযোগ এবং জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির ফেলোশিপের মতো অর্জন তাঁর ঝুলিতে রয়েছে।
নতুন এই যাত্রার প্রাক্কালে আরিফ সবার কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, ‘পিএইচডিতে ভর্তি হওয়া আমার স্বপ্নের শেষ নয়, বরং গবেষক হওয়ার দীর্ঘ পথের শুরু। আমি চাই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে গবেষণা করে অর্জিত জ্ঞান মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে।’ প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শারীরিক অসুস্থতার কারণে একসময় বিসিএস ও উচ্চশিক্ষা—দুটি স্বপ্নই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মেঘনা ও তিতাসবিধৌত এই জনপদ তিন দিক থেকে নদীবেষ্টিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকার খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে একসময় এলাকাটি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখন অবশ্য পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা যাওয়া যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় লেখাপড়ার চেয়ে খেলাধুলার প্রতিই আরিফের আগ্রহ ছিল বেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাধ্যমিকে ওঠার পর ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ তৈরি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ বেছে নিতে হয় তাঁকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০