দীর্ঘ ১১ বছর পর চীন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক কূটনৈতিক তোড়জোড়। বুধবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক চীনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে এই সফরের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই রানওয়েতে উপস্থিত থেকে শি জিনপিং ও তার প্রতিনিধি দলকে গ্রহণ করবেন। ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, সফরের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্মানে সামরিক বাহিনীর ৪৭৯ জন সদস্য গার্ড অব অনার প্রদান করবেন। সামরিক এই কুচকাওয়াজের সমাপ্তি ঘটবে আকাশে বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান এবং চারটি এফ-২২ র্যাপটর যুদ্ধবিমানের ফ্লাইপাস্টের মধ্য দিয়ে।
সফর ও আনুষ্ঠানিকতার রূপরেখা
- সফরের স্থিতি: দীর্ঘ ১১ বছর পর শি জিনপিংয়ের এই ওয়াশিংটন সফর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক।
- প্রস্তুতি অসন্তোষ: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের তথ্যমতে, সফরের প্রস্তুতি পর্বে ওয়াশিংটনের অগোছালো পরিকল্পনায় চীনা কর্মকর্তারা কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
- কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: তবুও বেইজিং এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে তাদের শীর্ষ কূটনীতির মূল ভিত্তি হিসেবেই দেখছে।
পরদিন বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক ট্রাম্পেটের সুরের সাথে ইস্ট অডিটোরিয়ামে শুরু হবে মূল আলোচনা। বৃহস্পতিবার রাতে ইস্ট রুমে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং শুক্রবার রেড রুমে চা-চক্র ও ন্যাশনাল আর্কাইভ পরিদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন দুই নেতা। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা জটিল ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বাণিজ্য বিরোধই মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
বাণিজ্যিক সম্পর্কে অচলাবস্থা কাটানো দুই পক্ষের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে স্বাক্ষরিত অস্থায়ী বাণিজ্য বিরতি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১০ নভেম্বর। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির নবায়ন না হলে উভয় দেশ আবারও পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝুঁকিতে পড়বে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য বলছে, বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের উদ্বৃত্ত এবার ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়তে পারে। এছাড়া এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদায় চীনের রপ্তানি গত মাসে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশটি আমদানির চেয়ে ১১৯ বিলিয়ন ডলার বেশি আয় করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ এখন ‘৩০ বাই ৩০’ নামের একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এই কাঠামোর আওতায় চীন ২৫ মিলিয়ন টন আমেরিকান সয়াবিন ও ১৭ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সীমিত রাখতে আগ্রহী।
রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ ধাতুর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এই আলোচনার একটি সংবেদনশীল অংশ। সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ির ইঞ্জিন ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে প্রয়োজনীয় এই খনিজ সরবরাহের ক্ষেত্রে চীন কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা আরোপ করেছে। আগামী ১০ নভেম্বর থেকে অতিরিক্ত পাঁচটি খনিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসছে, যা ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে জাপানের ক্ষেত্রে চীন যখন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, তখন জাপানি রেয়ার আর্থ চুম্বক রপ্তানি ৫২ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সামুদ্রিক খাবার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশ নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনা মডেলগুলোতে আমেরিকান জলছাপ পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এআই সংলাপে বেইজিং ও ওয়াশিংটন একমত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, সাইবার স্পেসের নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির মালিকানা নিয়ে তাদের মধ্যকার গভীর অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। তবে চীনা সামরিক কর্মকর্তা ঝো বো ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্পের অনুরোধ থাকলে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতায় চীন সক্রিয় হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বুধবার মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের রানওয়েতে যখন বোয়িং ৭৪৭ ট্রাম্প-ওয়ান অবতরণ করবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন এক কূটনৈতিক সূচনা হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৭৯ জন সেনাসদস্য সুসজ্জিতভাবে সারিবদ্ধ হয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সামরিক সম্মান জানাবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজকীয় এই আয়োজনের পর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং ম্যাডাম পেং লিউয়ান যৌথভাবে স্মিথসোশিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট পরিদর্শন করবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এই অভূতপূর্ব সামরিক প্রদর্শনী, লালগালিচা ও রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের ঠিক পেছনেই জমাট বেঁধে রয়েছে এক মারাত্মক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষক ডেভিড পিয়ারসন লিখেছেন, ওয়াশিংটনে বাইরে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে দুই দেশের টানাপোড়েন রয়েই গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে পাল্টাপাল্টি শুল্ক, রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজে চীনের নিয়ন্ত্রণ, এআই নিয়ে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এবং অদৃশ্য সাইবার হামলাসহ অনেক পুরোনো বিরোধের কোনো সুরাহা এখনো হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যের জটিল হিসাব-নিকাশ।






