
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় গন্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম আলীকদমের লিবলুহুং পর্বত। চিম্বুক রেঞ্জের গভীর অরণ্যে অবস্থিত এই পাহাড় ট্রেকারদের কাছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এক জায়গা। প্রায় ২,৭০০ থেকে ২,৮০০ ফুট উচ্চতার এই পর্বতের নাম নিয়ে স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত লোককথা রয়েছে। ম্রো ভাষায় 'লিবলু' শব্দের অর্থ কচ্ছপের মাথা এবং 'হুং' শব্দের অর্থ পাহাড়। দূর থেকে এই চূড়াটিকে অবিকল মাথা উঁচু করা এক বিশালাকার কচ্ছপের মতো দেখায়, যা থেকেই এই নামকরণের উৎপত্তি।
লিবলুহুংয়ের চূড়ায় পৌঁছালে আশেপাশের পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায়। এখান থেকে মীরঞ্জা ও মদক রেঞ্জের বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়ের ঢেউ খেলানো দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। তবে এই পাহাড়ের পথ মোটেও সহজসাধ্য নয়। ঘন বাঁশবন, সূর্যের আলো পৌঁছাতে অক্ষম এমন গভীর জঙ্গল এবং খাড়া রিজলাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেকাররা এক গা ছমছমে অনুভূতির মুখোমুখি হন। ট্রেইলের দীর্ঘ অংশে পিচ্ছিল পাথুরে ঝিরিপথ ও পাহাড়ি নদীর শীতল পানি পার হতে হয়। এছাড়া ম্রো পাড়া ও জুম চাষের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা এই অভিযাত্রায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
ভ্রমণটি সাধারণ পর্যটকদের জন্য নয়, বরং শারীরিক সক্ষমতাসম্পন্ন ট্রেকারদের জন্য। দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার আগে অন্তত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সিঁড়ি ওঠা, স্কোয়াট, হালকা দৌড় এবং ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ হাঁটার অভ্যাস করা জরুরি। ট্রিপে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসেবে হাইকিং বুট, ফার্স্ট এইড কিট, টর্চলাইট, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ও জোঁক প্রতিরোধক লবণ বা তেল সাথে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ি নিয়ম রয়েছে। গভীর বনে পথ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি এড়াতে নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড ছাড়া এই ট্রেইলে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। পাহাড়ি এলাকার সংবেদনশীলতার কারণে ভ্রমণের পূর্বে উপজেলা প্রশাসন থেকে পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া পাহাড়ি পথ সবসময় পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকে এবং বর্ষাকালে আকস্মিক ঢলের আশঙ্কাও থাকে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়া নেমে সেখান থেকে জিপ বা সিএনজি যোগে আলীকদম পৌঁছানো যায়। আলীকদম শহর বা পানবাজার থেকে বাজার-সদাই করে চাঁদের গাড়ি, মোটরবাইক, নৌকা বা হেঁটে দুছরি বাজার, আমতলী ঘাট কিংবা ২১ কিলো এলাকার দিকে এগিয়ে যেতে হয়। রুটটি সাধারণত আমতলী ঘাট থেকে শুরু হয়ে দুছরি বাজার, মেনিয়াং পাড়া, খেমচং পাড়া এবং রুংরাং বা ক্রিসতং ট্রেইল হয়ে লিবলুহুং সামিটে পৌঁছায়।
নাগরিক ব্যস্ততা থেকে দূরে পাহাড়ের নির্জনতা ও প্রকৃতির আদিম রূপ উপভোগ করতে লিবলুহুং এক অনন্য গন্তব্য। তবে পাহাড়ের নিয়মকানুন মেনে ও যথাযথ সতর্কতার সাথে ভ্রমণ করলে এই ট্র্যাকিং অভিজ্ঞতা জীবনের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০