
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কিলোমিটার হলেও, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই দুই দেশ একে অপরের পরিপূরক ও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত। উভয় দেশের ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৯৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি। তবে দীর্ঘ ঐতিহ্যের দিক থেকে চীন ৫ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার ধারক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার আড়াইশ বছরের পথচলা উদযাপন করছে। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বন্ধুত্ব ঠিক কতটা—তা জানার আগ্রহ অনেকের। তবে ইতিহাসের দিক থেকে চীনের আছে সুদীর্ঘ ৫ হাজার বছরের ঐতিহ্য। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র উদযাপন করছে দেশটির ২৫০ বছর পূর্তি। এই দুই নেতার বৈঠক নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে তাদের ভোজের থালায় কী কী খাবার উঠেছিল তাও সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি এড়ায়নি।
দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে 'থুসিদিদিস ট্র্যাপ' বা 'থুসিদিদিস ফাঁদ' তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করেছেন। গ্রিসের এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যকার ২৭ বছরের যুদ্ধের ঘটনা অবলম্বনে এই তত্ত্বটি তৈরি, যা বিশ্বশক্তির পালাবদলের সময় সংঘাতের ঝুঁকিকে বোঝায়। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংঘাত কমার চেয়ে বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। গত ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। চিরায়ত নিয়ম ভেঙে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প নিজেই অতিথিকে বরণ করে সংবাদ শিরোনাম হন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—শি জিনপিং ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা কামনা করছেন। এতে বলা হয়—এই ‘ফাঁদ’ এড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাতও এড়িয়ে চলা সম্ভব।
ঐতিহাসিকভাবে ১৭৮৪ সাল থেকে মার্কিন ব্যবসায়ীরা চীনে বাণিজ্য জাহাজ পাঠাতো, মূলত চা, রেশম ও চিনামাটির বাসন সংগ্রহের জন্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিপ্লব হলে সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ১৯৫০ সালে কোরীয় উপদ্বীপের সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরোক্ষভাবে মুখোমুখি অবস্থান নেয়, এমনকি এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিউনিস্ট চীনে পরমাণু বোমা ফেলার পরামর্শও দিয়েছিল।
নিজেদের নিরাপত্তা ও পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকতে চীন পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করে। ১৯৫০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আদর্শিক দূরত্ব তৈরি হলে চীন নিজস্ব প্রযুক্তিতে ১৯৬৪ সালে প্রথম পরমাণু বোমা এবং এর তিন বছর পর হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা চালায়। এটি বিশ্বমঞ্চে চীনের অবস্থানকে পুরোপুরি বদলে দেয় এবং তারা নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৭০ এর দশকে এই সম্পর্কের এক নতুন মোড় আসে 'পিংপং কূটনীতি'র মাধ্যমে। মার্কিন খেলোয়াড় গ্লিন কোয়ান ও চীনা খেলোয়াড় ঝুয়াং ঝেডংয়ের মধ্যকার এক অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎ থেকেই এই সম্পর্কের সূচনা। ১৯৭১ সালে মার্কিন টেবিল টেনিস দলকে চীনে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা তৎকালীন কঠিন কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও আলোচনার পথ প্রশস্ত করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফরে গিয়ে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন।
১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শাসনামলে ওয়াশিংটন বেইজিংকে চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং 'এক চীন নীতি' গ্রহণ করে। একই সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে 'তাইওয়ান সম্পর্ক আইন' পাস হয়। তবে ২০১৫ সালে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিকীকরণ নতুন করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনার জন্ম দেয়।
২০১৩ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর বারাক ওবামা মাও-নিক্সন যুগের সাফল্যের আদলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০১০ সালে চীন জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। দুই পরাশক্তির এই জটিল ও অম্ল-মধুর সম্পর্কই বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তার মূল নির্ধারক হিসেবে কাজ করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০