
প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেএএম মাজেদুর রহমান বর্তমানে মালদ্বীপ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের আড়ালে এখন গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ দানা বেঁধেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে মাজেদুর রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দেশত্যাগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, মাজেদুর রহমান অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির এবং তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিশাল অংকের অর্থ লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সিন্ডিকেটে থাকা অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে আদালত ইতিমধ্যে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ মিললেও সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, তদন্তের পরবর্তী ধাপে অনিয়মের এই পরিধি আরও বাড়তে পারে।
বিদেশে ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে আরামদায়ক জীবন কাটালেও মাজেদুর রহমান দেশে আসার পর পরিস্থিতির চাপে পড়েন। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে তিনি নানা অজুহাতে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলেও দুদকের কঠোর অবস্থানের কারণে আদালত তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আর্থিক খাতে লুটপাটে জড়িতরা সাধারণত পার পেয়ে যাওয়ার কৌশল রপ্ত করে ফেলেন, কিন্তু মাজেদুরের ক্ষেত্রে সেই হিসাব মেলেনি।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি থাকাকালীন এইচবিএম ইকবালের বিভিন্ন অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় মাজেদুর রহমান সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ব্যাংকের নির্বাহী পর্ষদের সদস্য সচিব হিসেবে চেক, বিল ও ভাউচার অনুমোদনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। অনুসন্ধানকারী দল এখন প্রতিটি লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করছে এবং রেকর্ডপত্রে যাদের নাম ও অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে, তাদের সবার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মাজেদুর রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করে দুদক আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকেও তার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। প্রিমিয়ার ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৬টি মামলার মধ্যে মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। কমিশন সক্রিয় থাকলে এই মামলার সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দুদকের নথিপত্র অনুযায়ী, এইচবিএম ইকবাল ও তার পরিবার প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ‘ইকবাল সেন্টার’ ভাড়া বাবদ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ এবং স্টেশনারি খাতে ব্যয় দেখিয়ে ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এফডিআর খুলে অবৈধ মুনাফা প্রদান, প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ লুটপাট এবং বিপিএল ও টেলিভিশনে ভুয়া প্রচারের নামে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মাজেদুর রহমানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে তিনি বারবার আদালতের কাছে অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। দুদক মনে করে, তাকে বিদেশে যেতে দিলে চলমান অনুসন্ধান ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুটি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাহী পর্ষদের ৯০১ নম্বর সভায় ‘কালার ওয়েব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৮৫ হাজার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই সভার সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর রহমান। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ হাজার প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে এবং এজন্য ভেন্ডরকে দেওয়া হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা। এতে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
একইভাবে ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ২ লাখ ৬৫ হাজার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তখনও সদস্য সচিব ছিলেন মাজেদুর রহমান। কিন্তু মাত্র ৯০ হাজার ক্যালেন্ডার সরবরাহ করে ভেন্ডরকে ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ৩ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই দুই কার্যাদেশ থেকে মোট ৮ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এইচবিএম ইকবাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেয়। সেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় মাজেদুর রহমানের নাম ৭ নম্বরে রয়েছে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বড় পরিসরে অনুসন্ধান চলছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ‘ইকবাল সেন্টার’ সিলগালা করেছে দুদক। ২৬ বছর ধরে এই ভবনটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। টানা কয়েকদিনের অভিযানে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নথি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অভিযোগের বিষয়ে মাজেদুর রহমান দাবি করেছেন, তাকে বোর্ডের সদস্য সচিব বলাটা ভুল, কারণ ব্যাংকে এমন কোনো পদ নেই। তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর কোনো প্রমাণ থাকলে তা উপস্থাপন করা উচিত। তবে দুদকের দাবি, অনুসন্ধানের পর্যায়ক্রমে যাদের সম্পৃক্ততা ও অনুমোদনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের সবার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ কারণেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে আদালতে অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি।
তাকে অন্যতম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ভবনেই ২৬ বছর ধরে প্রধান কার্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেছে ব্যাংকটি।
এদিকে বিদেশে ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসে বেশ ফুরফুরে মেজাজেই কাটছিল তার সময়।
দেশে দুর্নীতির পাঠ চুকিয়ে এবার বিদেশে গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাবেন, এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন তিনি।
দুদকের অনুসন্ধানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য ও রেকর্ডপত্র সামনে আসায় বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ও এখন অনিশ্চিত তার জন্য।
তা না হলে একজনের পর একজন অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে গিয়ে বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগ পাবেন।
এটি দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম।
রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওই ভবনে অভিযান চালায় দুদক।
পরে তল্লাশি শেষে তার চেম্বারসহ সেন্টার সিলগালা করে দেওয়া হয়।
কোম্পানি সেক্রেটারি শুধু রেকর্ড সংরক্ষণ করেন।
দুদকের যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে, সেটি আসলে থার্ড পার্টির অডিট রিপোর্ট।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০