
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত করা হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষার কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা স্থগিতের খবর শোনেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই ঘটনা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণের তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই বেকার। এ অবস্থায় সরকারি চাকরির জন্য তরুণদের স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ তাদের সেই স্বপ্নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা মনে করি, এটি সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় সংকট।
নিয়োগ পরীক্ষার এ ঘটনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে শুধুমাত্র কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়, তদন্তটি হতে হবে শতভাগ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি দায়িত্বে গাফিলতি থাকা কর্মকর্তাদেরও খুঁজে বের করে কঠোর আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী ও শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূলে ছিল সরকারি চাকরিতে অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদ, তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই পুরোনো সংস্কৃতি মেনে নেওয়া অসম্ভব। এ ঘটনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা সড়কে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ছাত্র–তরুণ–জনতার এত বড় আত্মত্যাগের পরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরোনো চর্চা ফিরে আসার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরীক্ষায় অনিয়মের ভয়াবহতা বোঝা যায় প্রার্থী সংখ্যার দিকে তাকালে। যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মাত্র ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩১৮ জন প্রার্থীকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় প্রার্থীদের যাতায়াত ও আবাসনের খরচ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানসিক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে, যার ফলস্বরূপ তারা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হয়েছেন।
সব সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা কেন কেবল ঢাকাতেই আয়োজন করতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিন লাখের বেশি প্রার্থী যখন ঢাকায় সমবেত হন, তখন রাজধানীতে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা যেভাবে বিভাগীয় শহরে আয়োজন করা হয়, নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সেই মডেল অনুসরণ করা সময়ের দাবি। এতে যেমন রাজধানীর ওপর চাপ কমবে, তেমনি প্রান্তিক পর্যায়ের চাকরিপ্রার্থীদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে। দেশের শ্রমবাজারের কথা চিন্তা না করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার হওয়ায় শিক্ষিতদের জন্য শোভন চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে উঠেছে।
অবশেষে, এই স্থগিত হওয়া পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পুনরায় আয়োজন করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এবারের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে হাজারো তরুণের কাছে পুরো নিয়োগ ব্যবস্থাটিই অবিশ্বাস্য ও অকার্যকর হয়ে পড়বে। নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করাই এখনকার বড় প্রয়োজন। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বাড়ছে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০