
চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬৬ হাজার ৪১৮টিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এতো বিপুলসংখ্যক মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাত্র আটজন বিচারকের ওপর। ১৬টি থানার অধীনে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর আইনি জটিলতা নিরসনে আদালতের এই অপর্যাপ্ত সংখ্যা বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় এই বিচারিক জট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৪১৮। অথচ এসব মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছেন মাত্র আটজন বিচারক। এ পরিস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রমের গতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আদালতের সংখ্যা ও বিচারক না বাড়ায় মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে মামলার শুনানি, আদেশ প্রদান এবং অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমে আদালত কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে গড়ে প্রতিটি মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর ৮ হাজার ৩০০টিরও বেশি মামলার ভার রয়েছে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকায় এই সীমিত সংখ্যক বিচারকের ওপর অমানবিক কাজের চাপ তৈরি হয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি বিচারকদের ওপরও অস্বাভাবিক কাজের চাপ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ১০৬টি, যা বর্তমানের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। তখন মামলার চাপ বিবেচনায় ২০০৮ সালে সর্বশেষ আদালত বাড়িয়ে আটটিতে উন্নীত করা হয়েছিল। এরপর থেকে নগরের জনসংখ্যা ও অপরাধের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও নতুন কোনো সিএমএম আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ৯৪৯টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৬৬ হাজার ২৪৯টিতে পৌঁছায়।
চলতি বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অক্টোবর মাস পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৪১৮টিতে। তবে গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৩ হাজার ৪৮৯টি, আগস্টে ১৪ হাজার ২০৬টি এবং জুলাইয়ে ৭ হাজার ৮৬০টি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শতাধিক নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও শ্লথ করে দিচ্ছে। ওই বছর ৩৯ হাজার ৮১৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়।
এই সংকট নিরসনে ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিনটি নতুন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং ২০টি নতুন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে একজন চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে মহানগরে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯২ সালে মামলার সংখ্যা ৮,৫৬৭টিতে দাঁড়ালে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা পাঁচজনে উন্নীত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও একটি পদ বাড়ানো হয়। কিন্তু বর্তমানের ক্রমবর্ধমান মামলার চাপের বিপরীতে এই অবকাঠামো অত্যন্ত নগণ্য। ফলে ক্রমবর্ধমান মামলার চাপ সামলাতে বিদ্যমান আদালতগুলোকে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৮,৫৬৭।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মফিজুল হক ভূঁইয়া জানান, বিচারক ও আদালত বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এখনো অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। কেবল নতুন বিচারক নিয়োগ দিলেই হবে না, বরং আদালতের অবকাঠামো সম্প্রসারণ জরুরি। দ্রুত নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০