
গাজা উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের প্রাক্কলন বলছে, এই কাজ শেষ করতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে এবং এতে ব্যয় হবে শত শত কোটি ডলার। বর্তমানে গাজার বিভিন্ন এলাকা জুড়ে থাকা এই ধ্বংসস্তূপ শুধু অবকাঠামোর ক্ষতি নয়, বরং এর নিচে এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে প্রবেশাধিকারও সীমিত রয়েছে। প্রথমে ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহা ও রড আলাদা করা হয়।
গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট বর্তমান পরিস্থিতির এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। একসময় যে রাস্তাটি অফিস ও বিপণিবিতানের কারণে সর্বদা সরগরম থাকত, তা এখন জনশূন্য। রাস্তার পাশে হেলে পড়া বহুতল ভবনগুলোতে এখনো ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে কয়েকটি বাস্তুচ্যুত পরিবার। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে রাস্তায় নোংরা পানি জমে জনস্বাস্থ্যের ওপরও হুমকি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান বৈরুত স্ট্রিটের একটি অংশ পরিষ্কারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে মনে হচ্ছে হাতে একটি চামচ নিয়ে পুরো সমুদ্র সেঁচে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির কারণে তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজার বর্তমান পরিস্থিতি তার প্রায় ২০ গুণ। দীর্ঘ দুই বছরের প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে এবং তার মধ্যে ৩ লাখ টন পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই পরিমাণ গাজার মোট ধ্বংসাবশেষের মাত্র দেড় শতাংশের মতো। গাজার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ অপসারণের ক্ষেত্রে ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রয়োজনীয় সরঞ্জামকে ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করে গাজায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া অবিস্ফোরিত বোমা ও বারুদ উদ্ধারকাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস এবং হ্যালো ট্রাস্টের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তের কাজ করছে, কিন্তু সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার কারণে তা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বর্তমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও নতুন করে হামলার কারণে অনেক সড়ক একাধিকবার পরিষ্কার করতে হয়েছে।
নতুন যন্ত্রপাতির অভাব মেটাতে জাতিসংঘ গাজাজুড়ে পাঁচটি কেন্দ্র পরিচালনা করছে যেখানে পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ ভাঙার কাজ চলছে। প্রকৌশলীরা যুদ্ধের আগেকার সাতটি পুরোনো মেশিন মেরামত করে সচল রেখেছেন, তবে খুচরা যন্ত্রাংশ ও তেলের সংকটে এসব মেশিন প্রায়ই অকেজো হয়ে পড়ে। প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানিয়েছেন, পুনর্ব্যবহৃত কংক্রিট দিয়ে রাস্তা মেরামত ও গর্ত ভরাট করা হচ্ছে, যা অস্থায়ী আশ্রয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। নতুন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী না পাওয়ায় ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি। পরে কংক্রিট ভেঙে ছোট টুকরোয় পরিণত করা হয়। পাশাপাশি তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ের নিচে এগুলো বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায়।
এই কাজের কিছুটা ইতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তেল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, ধ্বংসাবশেষ সরানোর ফলে ওই এলাকায় ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব কমেছে। চলাচলের রাস্তা উন্মুক্ত হওয়ায় ছোট ব্যবসায়ীরা আবার তাদের দোকান খুলতে পেরেছেন এবং শিশুদের খেলার জন্য কিছুটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর প্রায় ২০ দিনের মধ্যেই কিছু ছোট ব্যবসায়ী আবার দোকান খুলতে শুরু করেছেন।
তবে কেবল ইট-পাথর সরানোই মূল লক্ষ্য নয়, বরং ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার এবং ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা মানবিক একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ রেড ক্রসের সঙ্গে সমন্বয় করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত ও নথিপত্র তৈরির কাজ করছে। গাজার এই ধ্বংসস্তূপ সরানো কেবল পুনর্গঠনের শর্ত নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা ও মৌলিক সেবাগুলো পুনরায় চালুর জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০