মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, তাদের সমন্বিত সামরিক চাপের মুখে ইরান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্ব দিশেহারা হয়ে পড়বে এবং দেশটির সেনাবাহিনী ও অর্থনীতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হবে। তবে বাস্তবে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং গত ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাত এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত জুলাই মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ৬০ দিনের একটি শান্তি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দুই পক্ষই তখন নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গত ১৭ আগস্ট ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ইরানের কট্টরপন্থি নেতারা কূটনীতির পথ ছেড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তারা গোপনে যুদ্ধের কলেবর বাড়ানোর পাশাপাশি অভিজ্ঞ সামরিক জেনারেলদের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদে নিয়োগ দিয়েছেন।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে মোহসেন রেজাইয়ের নিয়োগ এবং বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান হিসেবে আহমাদ ওয়াহিদির অনুমোদনের বিষয়টি এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ওয়াহিদিকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় সরকারি আদেশে স্পষ্টভাবে ‘শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের’ প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। এর কয়েক দিন পরই বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি জানান, ইরান এখন আর কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
কৌশলগত এই পরিবর্তনের বিষয়ে একজন ইরানি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, নতুন এই পরিকল্পনায় শত্রুর হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ‘আক্রমণাত্মক অভিযান’ পরিচালনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওয়াহিদির উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে জানিয়েছেন, ইরানের সেনাবাহিনী এখন শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সক্ষমতা অর্জনের কাজ করছে। প্রয়োজনে শত্রুর সীমানায় আঘাত হানার নির্দেশ পালনে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, ইরানের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো এমন ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত, যারা যুক্তরাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ছাড় দেওয়ার চেয়ে সরাসরি সংঘাতকেই শ্রেয় মনে করেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসি মনে করেন, তেহরান এখন সামরিক দিক থেকে নিজেদের এগিয়ে রাখছে এবং শুধু হামলার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই আক্রমণের পরিকল্পনা করছে।
ইরানের এই কৌশলগত পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, ইরান এখন ‘যুদ্ধ নেই, শান্তিও নেই’ এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের চাপে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়ার চেয়ে আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নেওয়াকে ইরানি নেতৃত্ব হয়তো কম ক্ষতিকর মনে করছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা ইয়েমেন, ইরাক ও লেবাননের মিলিশিয়াদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াচ্ছে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন জোরদার করেছে।
তেহরানের নতুন আগ্রাসী কৌশলের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজ ও সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর হামলার হুমকিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়ে কথা বলেছেন। এছাড়া সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এডিএনওসির বেশ কিছু জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চায়।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এইচ এ হেলিয়ারের মতে, ইরান তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাকে এখন স্থায়ী রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে চাইছে। মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানের শর্ত পূরণ না হলে যুদ্ধের এই আক্রমণাত্মক কৌশল বিশ্বজুড়ে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরান পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরাসরি / রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ানো নিয়ে জটিলতা, আইন মন্ত্রণালয়ের যে মত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের নতুন কৌশল ট্রাম্পের জন্য অশনি সংকেত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কলকাতায় হোটেলে আগুন: মৃতদের মধ্যে আরও ২ বাংলাদেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর অনুরোধ জানিয়েও হালে পানি পাননি ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেভাবে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সব উদ্যোগে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধ থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে চায় মার্কিনিরা।






