বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১ কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে। ৫৮ বছরে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২৫০ থেকে বেড়ে ১ হাজার করা হলেও, সেই অনুপাতে চিকিৎসা সেবার পরিধি বা জনবল বাড়েনি। বর্তমানে এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে ৫০০ শয্যার পুরনো জনবল কাঠামো দিয়ে। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা ছাড়াও অবস্থানগত সুবিধার কারণে মাদারীপুর, বাগেরহাট এবং শরীয়তপুর ও লক্ষ্মীপুরের একটি অংশের লোকজন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে বহির্বিভাগেই প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার রোগী সেবা নেন। প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন, যা অনুমোদিত শয্যার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের ওয়ার্ড, বারান্দা এমনকি চলাচলের পথেও রোগীদের বিছানা পেতে থাকতে দেখা যায়।
বরগুনার ৭০ বছর বয়সী আবদুস সালাম সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন। গত রোববার বিকেলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেও শয্যা না পেয়ে পুরনো ভবনের নিচতলার বারান্দার মেঝেতে জায়গা নিয়েছেন। একই অবস্থা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেলাল হোসেনের ক্ষেত্রেও। মেঝেতে থাকা রোগীদের জন্য হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। দুর্গন্ধ ও নোংরার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে শৌচাগারগুলো, যা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসায় ৭০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত রোববার বিকেলে বরগুনা থেকে বরিশালে আসেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে কথা হয় আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই জ্বরে কাহিল। অবশ্য শয্যা না পাওয়া নিয়ে তাঁর আক্ষেপ নেই। তবে বেলাল হোসেন বলেন, হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
চিকিৎসক ও কর্মীর শূন্যপদের কারণে সেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ৩২৩টি অনুমোদিত চিকিৎসকের পদের মধ্যে ৯৪টি শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৯৭টি পদের মধ্যে ২৮২টি খালি। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ১৮৩ পদের বিপরীতে ৬৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৪১৪ পদের মধ্যে ২১৬টি পদ শূন্য রয়েছে। বহির্বিভাগের ৪ হাজার রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক আছেন মাত্র ৫৩ জন, অর্থাৎ প্রতি চিকিৎসককে গড়ে ৭৫ জন রোগী দেখতে হচ্ছে। প্রতিদিন বেলা তিনটার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই রোগীদের ভরসা হয়ে দাঁড়ান।
হাসপাতালের নতুন পাঁচতলা ভবনের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেখানে দিনে-রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এর ফলে লিফট, ফ্যান ও লাইট অকেজো হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও ২০-২৫টি থেকে কমে ১০-১২টিতে নেমে এসেছে। জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি সংকটে তা নিরবচ্ছিন্ন চালানো সম্ভব হয় না, কারণ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। নতুন ভবনে বিদ্যুৎ লাইন বৃদ্ধি ও জেনারেটরের জ্বালানি বরাদ্দের জন্য কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে।
গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট না থাকা এবং পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধার ঘাটতি রোগীদের ঢাকা যেতে বাধ্য করছে। হৃদ্রোগীদের জন্য ক্যাথল্যাব না থাকায় এনজিওগ্রামের মতো জরুরি সেবার জন্য অন্য হাসপাতালে ছুটতে হয়। ট্রলিম্যান ও হুইলচেয়ার সংকটের কারণেও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ট্রলিম্যানের ২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৯ জন, যারা অন্তর্বিভাগে ব্যস্ত থাকেন। হাসপাতালের ১৩টি ট্রলির মধ্যে সচল থাকে মাত্র ৯-১০টি, যেখানে রোগীর বর্তমান চাপ অনুযায়ী অন্তত ৫০টি ট্রলি প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি নিয়ে রোগীদের চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে।
৫ অক্টোবর এক বৃদ্ধের স্ট্রোকের পর ট্রলি না পেয়ে তাঁর নাতি রামিন হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সহায়তায় রোগীকে কোলে করে তিনতলায় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর জানিয়েছেন, নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন।





