মাধবকুণ্ড: জলপ্রপাতের আড়ালে প্রাণিজগতের এক অজানা জগৎ

প্রকাশ:
Print news

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত বললেই পর্যটকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা প্রবল জলধারা, ঝরনার শব্দ আর পানির কুয়াশার চাদর। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রটি বহুকাল ধরেই মানুষের কাছে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের প্রধান গন্তব্য। তবে একজন প্রাণিবিদের কাছে এই স্থানটি কেবল একটি জলপ্রপাত নয়, বরং এটি এক বিশাল জীববৈচিত্র্যের আধার, যেখানে পাথারিয়া পাহাড়ের গাছপালা, ঝোপঝাড় এবং অদৃশ্য প্রাণভুবন লুকিয়ে আছে। চারপাশের পাহাড়ি বন, পাথর, ঝোপঝাড়, গাছ থেকে পড়ে জমে ওঠা পাতার স্তর এবং অন্ধকারে সক্রিয় অসংখ্য ছোট প্রাণীও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তড়িঘড়ি করে পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে দেখি, দুই–তিন ডজন পুরুষ ব্যাঙ পানির ধারে ডাকাডাকি ও নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করছে। আজ দৃষ্টি ফেরাই মাধবকুণ্ডের জীববৈচিত্র্যের দিকে।

২০১২ সালের আগস্ট মাসে প্রথম মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দেখা যায়, তখন এলাকাটি ছিল অনেক বেশি বুনো ও প্রাকৃতিক। তখনকার তুলনায় বর্তমানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক বেশি হলেও, একসময়কার গভীর বন আজ কিছুটা সংকুচিত। আগে রাস্তাঘাট ছিল কাঁচা বা ইট বিছানো, আর বিশ্রামাগার ছিল ছোট টিন বা টালির ছাউনি দেওয়া। এখন সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও হারিয়ে যাচ্ছে বনভূমির সেই আদিম পরিবেশ, যা একসময় নানা ছোট প্রাণী ও সরীসৃপের নিরাপদ আশ্রয় ছিল। মজার ব্যাপার এই যে এসব প্রাণী আশপাশের দেশে এখনো দিব্যি বেঁচে আছে।

বন্য প্রাণিবিদ রেজা খানের মতে, জলপ্রপাতকে ঘিরে থাকা বনভূমির বাস্তুতন্ত্র বর্তমানে বড় ধরনের হুমকির মুখে। বন উজাড়, চা-বাগানের অপরিকল্পিত বিস্তার এবং মানুষের চাপ বাড়ার কারণে হাতি, গন্ডার, বাঘ ও ভালুকের মতো বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এখান থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে। তবে ছোট প্রাণীদের আবাসস্থল এখনও টিকে আছে, যদি না আমরা তাদের পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও বন উজাড়, চা–বাগানের বিস্তার, দখল, গাছ কাটা ও মানুষের অন্যান্য চাপের কারণে এখানকার প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। হাতি, গন্ডার, বুনো মহিষ, বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, গৌর, সাম্বারসহ বড় প্রাণীদের অধিকাংশই এখন এই বনভূমিতে আর নেই।

গত বছরের ১৫ আগস্ট পরিচালিত এক জরিপকালে দেখা গেছে, দিনের বেলা পর্যটকদের প্রচুর ভিড় থাকলেও রাতের নীরবতায় মাধবকুণ্ড পুরোপুরি পাল্টে যায়। জলপ্রপাতের পাদদেশে গিয়ে পর্যটন কোলাহলে যেসব প্রাণী অদৃশ্য থাকে, অন্ধকার নামতেই তারা বেরিয়ে আসে। রাতের বেলা সেখানে চশমাপরা হনুমানের ছোট দলের বিচরণ চোখে পড়েছে, যাদের আচরণ ও বিচরণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পর্যটন বাড়াতে সরকার এখানে ইকোপার্ক গড়ে তুলেছে।

নিশাচর প্রাণীদের মধ্যে স্থানীয় গাইডের সহায়তায় মাত্র ১০০ মিটারের ব্যবধানে তিনটি অপরিণত গন্ধগোকুল বা ভাম বিড়াল দেখতে পাওয়া গেছে। একই সময়ে গাছের ডালে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা মিলেছে চারটি লজ্জাবতী বানরের। এছাড়া জলপ্রপাতের পাদদেশে ঝিঁঝি পোকা ও সিকাডার অবিরাম শব্দের মাঝে চোখে পড়েছে সবুজ বোড়া বা গ্রিন পিট ভাইপার এবং কালকেউটে সাপের উপস্থিতি।

শীতকালীন এক গবেষণায় গত ডিসেম্বরে ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে বারডমোরের সরু মাথা ব্যাঙের প্রজনন কার্যক্রম লক্ষ্য করা গেছে। ডিসেম্বরের সেই শীতে প্রায় ১০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ৩০টিরও বেশি ব্যাঙের ডাক শোনা গিয়েছিল, যা প্রমাণ করে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে জলপ্রপাতের আশপাশের এই আর্দ্র জায়গাটি উভচর প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত উর্বর। ডিসেম্বরের শীতে কোন ব্যাঙের এমন সাহস হলো যে ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রজননের জন্য পানিতে নেমেছে।

দিনমজুর ও পর্যটকদের ফেলে দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভরশীল কাঠবিড়ালি থেকে শুরু করে বনের গভীরে থাকা দুর্লভ বনমালি বা ভেলভেট-ফ্রন্টেড নাটহ্যাচ—সবই এই বনের অখণ্ড অংশ। এই পাখিগুলো তাদের অনন্য পোকা ধরার কৌশলের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে। অথচ ক্রমবর্ধমান পর্যটন ব্যবস্থাপনায় এসব ছোট ছোট প্রাণীর আবাসস্থল প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে আসছে।

মাধবকুণ্ডের উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো বৃদ্ধি নয়, বরং এখানকার সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাও জরুরি। পর্যটন ও জীববৈচিত্র্য একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, তবে তা অবশ্যই প্রকৃতির ধারণক্ষমতা মাথায় রেখে করা প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা রাখা এবং বনের সংবেদনশীল অংশগুলোকে সংরক্ষিত রাখার মাধ্যমেই এই সম্পদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

সবশেষ হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাণিকুলের লাল তালিকা তৈরির মাঠপর্যায়ে জরিপ চালাতে গিয়ে দেখা গেছে যে, মাধবকুণ্ডের অনেক প্রাণীই এখন কেবল রাতের অন্ধকারে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদি জলপ্রপাতের আশপাশের ছড়া, পাথুরে আশ্রয়স্থল এবং পাতার স্তরগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তবে বনটির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। তাই সত্যিকারের ইকোপার্ক হিসেবে মাধবকুণ্ডকে বাঁচাতে হলে উন্নয়নের মূলে রাখতে হবে এই বন ও তার প্রাণিজগতকে।

মাধবকুণ্ডের বনাঞ্চল পাথারিয়া পাহাড়ের অংশ, যা বাংলাদেশের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা পেরিয়ে ভারতের আসামের করিমগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। বনের এই খণ্ডগুলো যখন বিভক্ত হয়ে যায়, তখন প্রাণীদের চলাচলের পথ ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়। তাই কেবল জলপ্রপাত নয়, পুরো বনভূমিকে একটি একক প্রাকৃতিক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের সাম্প্রতিক সফরে পাওয়া দেড় ফুট লম্বা কাঠিপোকা কিংবা বৃষ্টির সময় বেরিয়ে আসা উভচর প্রাণীরা এটাই প্রমাণ করে যে, এই বনের প্রতিটি স্তর প্রাণের স্পন্দনে ভরা। এই সৌন্দর্য রক্ষা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।

শেয়ার করুন
শিরোনাম :
দেশের মানুষের নিরাপত্তা নেই, বললেন জামায়াত আমির টাইব্রেকারে জিতে ফুটবলের ফাইনালে বান্দরবান সদর প্রতিরক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ বাড়াচ্ছে রাশিয়া, কাটছাঁট শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে এসবিএসি ব্যাংকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার নিয়োগ শুরু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি-২০২৬: নিবন্ধন চলবে অক্টোবর মাসজুড়ে মাধবকুণ্ড: জলপ্রপাতের আড়ালে প্রাণিজগতের এক অজানা জগৎ জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সহিংসতা, আটক ২ হাজার ট্রাম্পের হুমকির পর জ্বালানি বাজারে জি৭-এর ১০ কোটি ব্যারেল ফেসবুক পোস্ট নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ হাতছাড়া, শ্রীলঙ্কার কাছে হারল বাংলাদেশ ছুরিকাহত পাইলট স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতায় বাঁচল ফ্লাইদুবাইয়ের যাত্রীরা ব্রুনাইয়ে ১৪৮ পুরুষ কর্মী নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম ও শর্তাবলি স্ত্রী ও বাবার সঙ্গে ‘কাজরা রে টু’-তে নাচের আগ্রহ হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি নাবিকের যুদ্ধস্মৃতি রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামের বিশেষ গাড়িবহর নোবেল জয় কি এবারও অধরা ট্রাম্পের? সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় ২৭৬ কোটি ডলার আজকের খেলার সূচি (৩ অক্টোবর, ২০২৬) রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম ঢাকায়, সড়কপথে নেওয়া হবে পাবনায় দেশের মানুষের নিরাপত্তা নেই, বললেন জামায়াত আমির টাইব্রেকারে জিতে ফুটবলের ফাইনালে বান্দরবান সদর প্রতিরক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ বাড়াচ্ছে রাশিয়া, কাটছাঁট শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে এসবিএসি ব্যাংকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার নিয়োগ শুরু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি-২০২৬: নিবন্ধন চলবে অক্টোবর মাসজুড়ে মাধবকুণ্ড: জলপ্রপাতের আড়ালে প্রাণিজগতের এক অজানা জগৎ জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সহিংসতা, আটক ২ হাজার ট্রাম্পের হুমকির পর জ্বালানি বাজারে জি৭-এর ১০ কোটি ব্যারেল ফেসবুক পোস্ট নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ হাতছাড়া, শ্রীলঙ্কার কাছে হারল বাংলাদেশ ছুরিকাহত পাইলট স্মিত মচ্ছরের সাহসিকতায় বাঁচল ফ্লাইদুবাইয়ের যাত্রীরা ব্রুনাইয়ে ১৪৮ পুরুষ কর্মী নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম ও শর্তাবলি স্ত্রী ও বাবার সঙ্গে ‘কাজরা রে টু’-তে নাচের আগ্রহ হরমুজ প্রণালিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি নাবিকের যুদ্ধস্মৃতি রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামের বিশেষ গাড়িবহর নোবেল জয় কি এবারও অধরা ট্রাম্পের? সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় ২৭৬ কোটি ডলার আজকের খেলার সূচি (৩ অক্টোবর, ২০২৬) রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম ঢাকায়, সড়কপথে নেওয়া হবে পাবনায়