
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিদ্যুৎ-সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত শনিবার ও গতকাল দেশের একটি জেলা সদর এবং ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৫৮ দিন বয়সী শিশু হাফছা জাহান চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছে। শ্বাসকষ্ট কমাতে তাকে নিয়মিত নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সেবা ব্যাহত হচ্ছে। একই চিত্র চট্টগ্রামের পটিয়া ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে, যেখানে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রয়োজনীয় নেবুলাইজার সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পটিয়ায় দেড় বছরের মোফাছিরকে দিনে ছয়বার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও শনিবার মাত্র তিনবার দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে। ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশে ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল রাত ১২টায় ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট এবং শনিবার বেলা তিনটায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াটে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) তথ্যমতে, শুক্রবার তাদের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ঘাটতি ছিল ৪৬ শতাংশ।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ হাসপাতালের সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এক্স-রে, ইসিজি ও ল্যাবরেটরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটছে। অস্ত্রোপচার কক্ষের ইনচার্জ বিধান চন্দ্র রায় জানান, অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করতে হয়, কিন্তু তখন এসি চালানো সম্ভব হয় না। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ঘাম রোগীর কাটা স্থানে পড়ার ঝুঁকি থাকে। জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স বৃষ্টি রায় জানান, আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি সিজার করা হলেও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এখন একটি বা দুটির বেশি করা সম্ভব হচ্ছে না। গত শনিবার অস্ত্রোপচার শুরুর ১৫ মিনিট পর বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালিয়ে শাপলা বেগমের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হয়।
অনেক হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি তেলের অভাবে তা চালানো যাচ্ছে না। মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক রাজিব কিশোর বণিক জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এক্স-রে, ইসিজি ও নেবুলাইজেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাদের একমাত্র জেনারেটরটি চালাতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেলের প্রয়োজন, কিন্তু তা কেনার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। একই অবস্থা লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের, যেখানে ডিজেল বরাদ্দ না থাকায় জেনারেটর অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
কিছু হাসপাতালে আবার জেনারেটরের কোনো ব্যবস্থাই নেই। পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ গোলাম সরোয়ারের পক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হয় না। বেড়া জোনাল কার্যালয়ের ডিজিএম উত্তম কুমার সাহা জানান, ওই এলাকায় দিনে ২৫-৩০ শতাংশ এবং রাতে ৩৫-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই চিত্র। কুলাউড়ায় রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে মোমবাতি জ্বালিয়ে এবং মুঠোফোনের টর্চের আলোয় চিকিৎসকদের রোগী দেখতে হয়।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লো-ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে মেশিন প্রায়ই অচল হয়ে পড়ছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এস এম আমিরুল ইসলাম মোমেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে করাতে এসে কামরুল ইসলাম নামের এক রোগী এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পরীক্ষা না করিয়েই ফিরে গেছেন। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও লো-ভোল্টেজের কারণে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বরে আক্রান্ত আশিক হোসেনের মা আসমা খাতুন হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে ছেলেকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭০ বছরের আমজাদ হোসেনের স্ত্রী আলেয়া খাতুন জানান, রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় তার স্বামী ঘুমাতে পারছেন না। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত শনিবার ১২ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ দফায় প্রায় পৌনে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। সেখানে ভর্তি থাকা শামীমা বেগম জানান, তিন দিন ধরে তিনি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কষ্ট পাচ্ছেন। কুলাউড়া ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী ও স্বজনরা জানিয়েছেন, সেখানে দিনে-রাতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে কখন বিদ্যুৎ আসবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন মা কামরুন নাহার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনকি প্যাথলজি পরীক্ষাও থেমে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশে গ্যাসের সংকটের সঙ্গে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলছে বিদ্যুতের সংকটও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে, গরম পড়লে বেড়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুরুতে লোডশেডিংয়ের পুরোটাই ছিল ঢাকার বাইরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হঠাৎ অন্ধকার নেমে এলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেলা একটার দিকে অস্ত্রোপচারকক্ষের সামনে ছিল রোগীর স্বজনদের ভিড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শিশুটিকে ওটি থেকে বের করে আনা হলেও তখনো মায়ের অস্ত্রোপচার শেষ হয়নি, সেলাই চলছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০