
বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে এক ধরনের মৌলিক বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের উচ্চাভিলাষী কথা বলে আসছে; অন্যদিকে, পুরো বাণিজ্যব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো রয়েছে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে সুরক্ষিত দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের কাছে অনেক বেশি লাভজনক। ফলে এমন কিছু নীতি বহাল রেখেই আমরা রপ্তানি বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছি, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানির চেয়ে দেশীয় বাজারে বিক্রিকে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলছে।
তৈরি পোশাক খাত অবশ্য এই সমস্যা থেকে অনেকটা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা এবং কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ থাকায় এই খাতটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পেরেছে। তবে চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলো একই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এসব খাতকে অযৌক্তিক শুল্ককাঠামো, মানসংক্রান্ত জটিলতা, উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা বাধার মোকাবিলা করতে হয়, যা তাদের সক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। আসল পরীক্ষা হলো, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা সংকুচিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে ওঠার আগেই বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের বাইরে যথেষ্টসংখ্যক প্রতিযোগিতা সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে কি না। নতুন পে স্কেলে স্বস্তির আড়ালে আর্থিক ঝুঁকি। পোশাক রপ্তানিকারকদের এমন একটি বিশেষ ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে তারা শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় ঘনিয়ে আসায় এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। যদিও সরকার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে, তবুও এই উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জিএসপি কাঠামোর আওতায় উত্তরণ পরবর্তী আরও তিন বছর, অর্থাৎ অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের 'এভরিথিং বাট আর্মস' বা ইবিএ সুবিধা বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কিছুটা সময় দিলেও বাণিজ্যব্যবস্থার মূল দুর্বলতাগুলো এতে দূর হবে না।
দেশের শুল্ককাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে প্রচলিত আমদানি শুল্ক কিছুটা কমলেও বিভিন্ন ধরনের সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য করের কারণে অনেক খাত উচ্চমাত্রার সুরক্ষা ভোগ করছে। এই বাড়তি সুরক্ষা রপ্তানির বিপরীতে এক প্রকার নিরুৎসাহ সৃষ্টি করে। উৎপাদকরা যখন দেখেন যে স্থানীয় বাজারে অনায়াসেই বেশি মুনাফা পাওয়া সম্ভব, তখন তারা আন্তর্জাতিক মানের কঠোর শর্ত পূরণ বা পণ্য মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। এভাবে দেশের শিল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই পরিবর্তন এত ধীরগতিতে কেন হচ্ছে, তার একটি বড় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় শুল্ককাঠামোর মধ্যে। চূড়ান্ত পণ্য যদি উচ্চ সুরক্ষা পায়, অথচ আমদানি করা যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও মধ্যবর্তী উপকরণের দাম বিভিন্ন শুল্ক-কর আরোপের কারণে বেশি থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে দেশীয় বাজারকেন্দ্রিক হওয়ার শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি হয়।
অর্থনৈতিকভাবে এই সমস্যার সাথে রাজস্ব খাতের অসংগতি সরাসরি জড়িত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দীর্ঘ সময় ধরে আমদানি শুল্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে বাণিজ্যনীতি যেখানে সুরক্ষার দেয়াল কমাতে বলছে, রাজস্বনীতি সেখানে সীমান্ত থেকেই বেশি রাজস্ব আদায়ের চাপ বজায় রাখছে। এই দুইয়ের ভারসাম্যহীনতা দেশের শিল্পায়নের পথে বড় অন্তরায়।
বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রথম এই ধরনের উদ্যোগ, যা পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক বাণিজ্যের দিকে একটি নতুন মোড়। এছাড়া ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আরসিইপি মন্ত্রীরা বাংলাদেশের জন্য একটি যোগদানসংক্রান্ত কার্যকর দল অনুমোদন করেছেন। এই আঞ্চলিক সংযুক্তি বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করলেও, একই সঙ্গে তা স্থানীয় সুরক্ষিত শিল্পগুলোকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে।
ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুরক্ষানির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। সুরক্ষার সুবিধাভোগীদের চাপ উপেক্ষা করে শুল্ককাঠামো সহজ করা, বন্ডেড সুবিধা সব সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে বিস্তৃত করা, শুল্ক প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারকে জোর দিতে হবে। নতুবা পুরোনো প্রণোদনা কাঠামো ধরে রাখার অর্থনৈতিক ব্যয় ভবিষ্যতে আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
লেখক: সেলিম রায়হান, অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০