
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের শততম জন্মবার্ষিকী আজ, ৩ সেপ্টেম্বর। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন, যার মধ্যে অস্কারজয়ী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সাথে তাঁর রসায়ন ছিল অনন্য। মহানায়কের এই বিশেষ দিনে ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে তাঁর সাথে কাটানো বিভিন্ন মুহূর্ত ও কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন সত্যজিৎ রায়ের পুত্র পরিচালক সন্দীপ রায়।
সন্দীপ রায়ের স্মৃতিতে উত্তম কুমার মানেই এক অসামান্য ক্যারিশমা। তিনি জানান, ছোটবেলায় ‘দেয়া নেয়া’, ‘সপ্তপদী’ বা ‘হারানো সুর’-এর মতো সিনেমাগুলো হলে গিয়ে দেখার অভিজ্ঞতা আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে। পরবর্তীতে টেলিভিশনের পর্দায় বারবার উত্তম কুমারের সিনেমা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। সেই সময়ের বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের টেকনিশিয়ান, পরিচালক এবং অভিনয়ের মান ছিল অতুলনীয়। উত্তম কুমারের স্টারডমের একটি বড় অংশ ছিল তাঁর রহস্যময়তা; তিনি খুব বেশি জনসমক্ষে বা অনুষ্ঠানে যেতেন না, ফলে দর্শকদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে এক ধরনের প্রতীক্ষা ও আকর্ষণ সবসময় কাজ করত।
সত্যজিৎ রায়ের সাথে উত্তম কুমারের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দীপ রায় বলেন, ‘নায়ক’ সিনেমাটি যেন উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছিল। মেকআপহীন স্বাভাবিক উত্তম কুমারকে পর্দায় তুলে ধরার জন্য সত্যজিৎ রায় যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তা শুরুতে উত্তমবাবুর কাছে কিছুটা উদ্বেগের ছিল। তবে প্রসেসিংয়ের পর ফুটেজ দেখে তিনি আশ্বস্ত হন এবং শুটিংয়ে দারুণ এক কেমিস্ট্রি গড়ে ওঠে। একইভাবে ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমার ক্ষেত্রেও উত্তম কুমারই ছিলেন নির্মাতার প্রথম পছন্দ। এমনকি হার্ট অ্যাটাকের মতো শারীরিক অসুস্থতার পরেও সুস্থ হয়ে তিনি সবার আগে এই সিনেমার কাজ শেষ করেছিলেন।
ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে সন্দীপ রায় জানান, লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে ছোটবেলায় উত্তম কুমারের অটোগ্রাফ নেওয়ার সেই মুহূর্তটি তাঁর কাছে আজও অমূল্য। অভিনয়ের বাইরে মানুষ হিসেবে উত্তম কুমার ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ ও বিনয়ী। সেটে চা পরিবেশনকারী থেকে শুরু করে সহকর্মী—সবার সাথেই তিনি সমান সম্মান ও ভদ্রতা বজায় রাখতেন। কোনো সুপারস্টারের মতো আচরণ বা ট্যানট্রাম তাঁর মধ্যে কখনোই দেখা যায়নি।
সন্দীপ রায়ের মতে, উত্তম কুমার শুধু সংলাপ বলতেন না, বরং প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে আরও জীবন্ত করা যায়, তা নিয়ে সবসময় ভাবতেন। ‘নায়ক’ সিনেমার সেই বিখ্যাত সই করার দৃশ্যে ফাউন্টেন পেনের কালি না বেরোলে নিবটি জলের গ্লাসে ডুবিয়ে নেওয়ার আইডিয়াটি ছিল উত্তম কুমারের নিজস্ব তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন। এছাড়া, সংলাপহীন দৃশ্যেও তাঁর চোখের ভাষা ও শারীরিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে অভিনয়ের যে দক্ষতা, তা অন্য অভিনেতাদের থেকে তাঁকে আলাদা করে রাখত।
পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর স্মরণসভায় উত্তম কুমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এরকম অনেকের সঙ্গেই কাজ করেছি। অনেক নায়কের সঙ্গেই কাজ করেছি এবং তাদের সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু উনার মতো আর কেউ হবেন না।’ এই উক্তিটিই মহানায়কের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। সত্যজিৎ রায়ের সহকারী পরিচালকদের অনুরোধে ‘চিড়িয়াখানা’ করার সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে রবি কাকার পরিচালনায় ‘নিধিরাম সর্দার’-এর শুটিং দেখার স্মৃতিগুলো সন্দীপ রায়ের কাছে আজও উত্তেজনার।
পরিশেষে, উত্তম কুমারের সিনেমাগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রিস্টোর করার ওপর জোর দিয়েছেন সন্দীপ রায়। তাঁর মতে, মহানায়ক উত্তম কুমারকে আমরা তাঁর সিনেমার মাধ্যমেই বাঁচিয়ে রাখি। একশ বছর পেরিয়ে এসেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিনয়শৈলী এবং ক্যারিশমা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বাংলা চলচ্চিত্রের এই সম্পদকে টিকিয়ে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি, কারণ তাঁর মতো শিল্পী আর দ্বিতীয়টি তৈরি হওয়া অসম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উত্তম কুমার নামটা শুনলেই আমার অনেক কিছু মনে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অবশ্যই মহানায়ক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে খুব অল্প বয়সে উত্তমবাবুর সিনেমা দেখেছি, এমনটা বলব না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখনকার কলকাতার সিনেমা এখনকার থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঝেমধ্যে উত্তমবাবুর পুরোনো সিনেমা আবার রিলিজ করত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘চিড়িয়াখানা’ যখন রিলিজ করল, তার আগে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ আবার রিলিজ করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হয়তো এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাচ্ছি, মাঝের ঘরে টিভিতে উত্তমবাবুর সিনেমা চলছে, হঠাৎ আটকে গেলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখনকার বাংলা সিনেমাকে সত্যিই স্বর্ণযুগ বলা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০