
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতির কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ট্রাম্প প্রশাসনের ছয়টি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাতের সমাপ্তি ঘটলে আগামী বছর থেকেই অঞ্চলটিতে সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এই পরিকল্পনা নিয়ে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বর্তমানে নীরবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হবে। গত ২৫ বছর ধরে ওয়াশিংটন বারবার এই অঞ্চল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে সংঘাত এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের কারণে তাদের বারবার ফিরে আসতে হয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন ঘাঁটির দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং এক ডজনের বেশি ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। তবে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যেসব সেনা সেখানে অবস্থান করবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু স্থাপনা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির মাত্রা নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছেন। এর মধ্যে কিছু ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ঘাঁটির বাইরে স্পর্শকাতর অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, ঘাঁটির দুর্বলতাগুলো আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু তা নিয়ে যথেষ্ট জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের সময় সেখানে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই সংখ্যা কখনোই এক লাখের নিচে নামেনি। ২০১১ সালে বারাক ওবামা সেনা কমানোর ঘোষণা দিলেও আইএসের উত্থানের পর পুনরায় সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়। এরপর থেকে সেনাসংখ্যা ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করেছে।
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। রিয়াদে সিআইএর একটি ঘাঁটি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়া বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের ঘাঁটিও হামলার শিকার হয়েছে। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা তৃতীয় জুলস জে হার্স্ট জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি মেরামতের ব্যয় এখনো স্পষ্ট নয় এবং এটি ভবিষ্যতের সামরিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সেনা কমিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আগ্রহী। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলমান থাকায় বিমান হামলা পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এখনই ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহরের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা সহসাই ফিরছেন না।
ইতিহাসবিদ জেফরি রগের মতে, নাইন-ইলেভেনের আগে সিআইএর কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সংস্থাটি নতুন মিশনের সন্ধানে ছিল। কিন্তু ৯/১১-এর পর তারা ব্যাপকভাবে আধা-সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় যারা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ শুরু করে। তবে দুই দশকের এই সম্পৃক্ততা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলো বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে ফিরিয়ে এনেছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়িয়ে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ফলে ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
বর্তমানে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বা সিআইএ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা মাথায় রেখে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে রয়েছে, যার অনেকগুলোই মূলত স্বাগতিক দেশগুলোর অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তির কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত সপ্তাহে ইরান হামলা চালিয়েছে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান কেমন হবে, সেটি মূল্যায়নের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্থাটিতে সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন বিশ্লেষক ছিলেন, তবে তাঁদের সংখ্যা বেশি ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে দুই সংস্থাই ওই অঞ্চলে গত দুই দশকের সম্পৃক্ততায় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, একের পর এক সংকট ও নীতিগত সিদ্ধান্ত—যার মধ্যে আইএসের অপ্রত্যাশিত উত্থান এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শীর্ষ ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার ঘটনাও ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এ কৌশল ফল দিতে কত সময় লাগতে পারে, তার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০