
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের এক মাইলফলক। এই ম্যাচের মাধ্যমেই তিনি আর্জেন্টিনার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেন। দুই দশকের দীর্ঘ পথচলা শেষে এই বিদায় মুহূর্তটি ভক্তদের মনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। মেসির এই অবসরের ঘোষণার পর সারা বিশ্বের অসংখ্য ভক্ত যেন মানসিকভাবে এক ধরনের স্থবিরতায় ভুগছেন।
লিওনেল মেসির সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের শুরু ২০০৬ সালে। তৎকালীন বোর্ডিং স্কুলের কড়া নিয়মের মাঝে লুকিয়ে আনা একটি ম্যাগাজিন থেকে আমার প্রথম দেখা এই বাদামি চুলের কিশোরের সাথে। তেরো বছর বয়সে তাকে ঘিরেই জীবনের প্রথম ভালো লাগার জন্ম। সেই কিশোরী বয়সের মুগ্ধতা থেকে শুরু করে জীবনের একটা বড় সময় মেসিকে অনুসরণ করা, তার খেলা দেখার জন্য নিয়ম ভাঙা কিংবা পাতা থেকে ছবি সংগ্রহ—এসবই ছিল আমার কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ এত বছর পর উপলব্ধি করি, মেসিকে দেখতে দেখতেই আমি বড় হয়েছি, যা আমার জীবনের একটি অভ্যস্ততায় পরিণত হয়েছে। ভাবছি, লেখাটা কীভাবে শুরু করলে পরিপূর্ণ শোনাবে। উত্তরটা খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালে।
আমাদের নামের মিল এবং জন্মস্থান নিয়ে নানা কাকতালীয় ঘটনাও অদ্ভুত আনন্দ দিত। তার জন্মস্থান রোজারিও এবং আমার পদবিও রোজারিও—বিষয়টি ভাবলে আজও হাসি পায়। ইন্টার মায়ামিতে খেলা শুরু থেকে বিশ্বমঞ্চের নানা জয় পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমার নিজের জীবনের অর্জনের মতোই মনে হতো। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপের সময় কুসংস্কার বা ‘কাবালা’র বশবর্তী হয়ে আমি নানা নিয়ম মেনে চলতাম। আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনালের শেষ ৩০ মিনিট তো ভয়ে টিভি দেখার সাহসই পাইনি; ল্যাপটপ বন্ধ করে বাইবেল নিয়ে প্রার্থনায় বসেছিলাম যেন ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি না হয়। সেবার মেসি যখন শিরোপা জিতলেন, মনে হলো যেন আমিও জিতেছি। কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের কখনো দেখা হয় না। যতটা সহজে কথাটা লিখছি, বাস্তবটা ততটাই কঠিন হয়ে ধরা দিচ্ছে।
পরবর্তীতে প্রতিটি বড় ম্যাচে আমি একইরকম স্নায়ুচাপে ভুগতাম। এবারের ফাইনালের সময় খেলা শুরুর ১৫ মিনিট পর থেকেই আর টিভি দেখার সাহস করতে পারিনি। আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচেও আমি অন্য রুমে গিয়ে ডায়রিতে বারবার লিখেছি যেন আর্জেন্টিনা জিতে যায়। আমার এই পাগলামির কারণ একটাই—মেসির প্রতি ভালোবাসা। মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং তার বিনয় এবং শিশুসুলভ আবেগ তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে। ডায়েরির তিনটি পাতায় তার এই রাজকীয় বিদায়ের ঘোষণা আমাদের অবাক করলেও বাস্তবতা হলো, আজ সেই দিন যেদিন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি শেষবার মাঠে নামলেন।
মেসি হয়তো কখনোই জানবেন না যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে কেউ তার বিদায়ের সাথে সাথে নিজেও যেন ফুটবলের সাথে নিজের আবেগীয় অবসর নিয়ে ফেলেছে। ২০০৬ থেকে ২০২৬—এই বিশ বছরের স্মৃতি আমার সত্তার সাথে মিশে আছে। মেসিকে আর আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে না, এই নির্মম সত্যের সাথে মানিয়ে নিতে হয়তো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। বিদায় লিও, তুমি ভালো থেকো। আমার কৈশোরের সেই প্রিয় মানুষ, তোমার এই বিদায় মুহূর্তটি আমার হৃদয়ে আজীবন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতার ছায়া হয়ে থাকবে। তাঁরা জানেনও না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেউ তাঁদের আনন্দে খুশি হয়, তাঁদের মন খারাপ হলে নিজেও বিষন্ন হয়ে পড়ে। ফুটবলের সঙ্গে তখন আমার দূরদূরান্তেরও কোনো সম্পর্ক ছিল না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০