যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের সেন্ট্রাল পার্কে দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়িতে ভ্রমণের ব্যবস্থা। পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় হলেও এই প্রাচীন পরিবহন ব্যবস্থাটি এখন বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। শহরের আইনপ্রণেতারা সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়ির চলাচল স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলে এই বিষয়ক বিলটি নিয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। মেয়র জোহরান মামদানির কার্যালয় জানিয়েছে, স্পিকারের সঙ্গে এই বিল নিয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং এটি পাস হওয়ার মতো যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে। গাড়িতে চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে সেন্ট্রাল পার্কে যান অসংখ্য দর্শনার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মেয়র মামদানি লিখেছেন, ‘নিউইয়র্কে ঘোড়ার গাড়ির শিল্প বন্ধ হতে যাচ্ছে।’। তবে ঘোড়ার গাড়ির চালক ও ঐতিহ্যটির সমর্থকেরা ভিন্নমত পোষণ করেন।
এই উদ্যোগের পেছনে মূলত গত জুনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কাজ করেছে। ভারত থেকে আসা ১৮ বছর বয়সী পর্যটক রোমাঞ্চ মহাজন পরিবারের সঙ্গে সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়িতে চড়েছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটি আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত ছুটতে শুরু করলে গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারান। এই ঘটনার পর ঘোড়ার গাড়ি বাতিলের দাবি নতুন করে জোরালো হয়। রোমাঞ্চের বাবা দীপক মহাজন নিউ ইয়র্ক সিটি হলে গিয়ে সরাসরি কর্তৃপক্ষের কাছে এই দাবি জানান এবং ভিডিও কলে শুনানিতে অংশ নিয়ে জানান, এ ঘটনা তাঁদের পুরো পরিবারকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। পরিবারের কেউ কেউ ভিডিও কনফারেন্সেও যুক্ত হন। মাকে সাহায্য করতে গিয়ে গাড়ি থেকে লাফ দেন তাঁর ছেলে।
সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, রোমাঞ্চের অকাল মৃত্যু প্রমাণ করেছে বিদ্যমান ব্যবস্থা আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, সেন্ট্রাল পার্কে মানুষের ভিড় বাড়ায় এই ঐতিহ্য জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিলটি পাস হলে ২০২৮ সালের মধ্যে সেন্ট্রাল পার্ক থেকে এই ঘোড়ার গাড়ি পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া হবে। নিউ ইয়র্কের টানা তিনজন মেয়রও অতীতে এই ব্যবস্থা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আধুনিক ও জনবহুল একটি নগরে অতীতের স্মৃতি বহনকারী এই বিনোদনব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরেই প্রাণী অধিকারকর্মীরা ঘোড়ার গাড়ির বিপক্ষে সরব রয়েছেন। তাঁদের দাবি, ব্যস্ত সড়ক ও জনাকীর্ণ পার্কে ঘোড়া ব্যবহার করা অনুচিত। গাড়ির শব্দ ও পথচারীদের ভিড়ে ঘোড়াগুলো প্রায়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, যা অতীতেও একাধিক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে। দুর্ঘটনার পর অনেকবারই রাস্তায় ঘোড়া পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা শুধু ছেলেকে হারানোর কথাই ভাবি।’। অতীতেও কয়েকবার ঘোড়া রাস্তায় পড়ে গেছে, ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করেছে কিংবা গাড়ি ও অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে।
তবে এই ঐতিহ্যের সমর্থক এবং গাড়িচালকদের মতে, ঘোড়ার গাড়ি নিউ ইয়র্কের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পুরোনো দিনের নিউ ইয়র্কের আবহ ধরে রাখতে এই গাড়িগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধ্রুপদি সিনেমা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও এই গাড়ির নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এই ঐতিহ্য মুছে ফেললে নিউ ইয়র্ক তার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির একটি পরিচিত অনুষঙ্গ হারাবে। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে ঘোড়ার গাড়ি হয়ে উঠেছে নিউইয়র্কের ইতিহাসের অংশ, পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ধ্রুপদি সিনেমা ও টেলিভিশনের নানা দৃশ্যেও এই গাড়িগুলো জায়গা করে নিয়েছে।






