ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মোকাবিলায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে প্রশাসন। কর্মসূচিটি ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে এবং নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিনসহ বিভিন্ন স্টেশনে অন্তত ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বসানো হয়েছে বহুতল ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক। পরিস্থিতি সামাল দিতে দাঙ্গা দমনে ব্যবহৃত বিশেষ গাড়ি মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের খোঁজে বাসেও তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ভিড় এড়ানো, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক ও সতর্কতামূলক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি রয়েছেন বলে পুলিশের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পুলিশের বিশেষ দল প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে এবং তাদের বেশ কয়েকজনকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকা থেকে প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটক। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীরা পুলিশের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’সহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভের অন্যতম লক্ষ্য ছিল যন্তর মন্তরে সমবেত হয়ে প্রতিবাদ জানানো। বিক্ষোভের আয়োজক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ মুম্বাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, রেলওয়ে, মেট্রো, ইন্টারনেট ও রাস্তাঘাট বন্ধ করা সরকারের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ। তবে শুক্রবারই দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, এই বিক্ষোভের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। আইন অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছে ন, শনিবার সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত যন্তর মন্তরে তাদের সমবেত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তাদের দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা তাদের মৌলিক অধিকার।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিজেপির ভাষ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই তাদের নির্বাচনী সাফল্যের মূল কারণ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন, ৩ কোটি ভোটারের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারকে মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, এটি খসড়া সংশোধনের প্রাথমিক হিসাব মাত্র এবং যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ভুলবশত কারো নাম বাদ পড়লে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে কমিশনের ভেতরেই প্রশ্ন ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলেও তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা নিয়ে এই বিতর্ক ও নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর আপত্তির জেরে বর্তমানে ভারতজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০