জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নির্বাচনে উগ্র জাতীয়তাবাদী দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডি অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করেছে। অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানিতে প্রথমবারের মতো এমন কোনো উগ্রবাদী দল ক্ষমতার স্বাদ পেতে যাচ্ছে। এএফডির এই উত্থানে কেবল জার্মানি নয়, পুরো ইউরোপেই এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। মেকলেনবুর্গ-ভেস্টার্ম পমেরানিয়া রাজ্যে ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে দলটি। একই সঙ্গে বার্লিনে বড় জয় পেয়েছে বামপন্থি দল ডি লিংক, যারা ২৫ শতাংশের বেশি ভোট নিয়ে শহরটিতে সবচেয়ে শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচনের এই ফলাফল ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ-এর নেতা ও চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের জন্য বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত ১৬ মাসে তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। বর্তমানে ম্যার্ৎসের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হার মাত্র ১০ শতাংশের সামান্য ওপরে। এর আগে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যেও সিডিইউ পরাজিত হয়েছিল। দুই সপ্তাহ আগে ট্রাম্পপন্থি ও মস্কোঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এএফডি সেখানেও সিডিইউকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছিল। এএফডির দাবি, এমন বিপর্যয়কর ফলাফলের পর ম্যার্ৎসের চ্যান্সেলর পদ থেকে পদত্যাগ করা উচিত।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ম্যার্ৎস গত রোববার এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণে তিনি স্বীকার করেন, মেকলেনবুর্গ-ভেস্টার্ম পমেরানিয়া রাজ্যে তার দল বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। নির্বাচনের পর সেখানে সিডিইউর ভোট ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যার ফলে রাজ্য পার্লামেন্টে দলটি কোনো আসন পাচ্ছে না। বার্লিনেও বামপন্থি ডি লিংকের কাছে সিডিইউর শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। ম্যার্ৎস এ সময় মন্তব্য করেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা কমছে এবং ডান ও বাম উভয় ধারার কট্টরপন্থি দলগুলো এই আস্থাহীনতাকে কাজে লাগাচ্ছে।
নিজ দলের অন্দরেও ম্যার্ৎসকে নিয়ে গুঞ্জন চলছে। তিনি কি চ্যান্সেলর পদে টিকে থাকতে পারবেন, নাকি দলপ্রধান হিসেবে তাকে সিডিইউ/সিএসইউ জোট সরিয়ে দেবে—এমন নানা জল্পনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে হেনড্রিক ভুস্ট ও মার্কাস সুডারের নাম শোনা যাচ্ছে। যদিও আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা নতুন কোনো নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী নন, তবে ম্যার্ৎসের প্রতি সরাসরি ব্যক্তিগত সমর্থন কেউ দেননি। নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ম্যার্ৎস নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সফর বাতিল করে আগামী কয়েক দিনের কর্মসূচিও স্থগিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক পরপরই ম্যার্ৎসের এই তৎপরতা মূলত তার পদত্যাগের গুঞ্জন থামানোর একটি চেষ্টা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভার লেম্বকে একে ‘আত্মরক্ষামূলক নেতৃত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এদিকে দেশের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে ৮৪ শতাংশ জার্মান নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত মে মাসে ক্ষমতায় আসার সময় ম্যার্ৎস অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপে এখন এএফডি এগিয়ে রয়েছে, যা ম্যার্ৎসের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
দেশটিতে অন্যান্য খাতের অবস্থাও নাজুক। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাসভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব নিয়ে তোলপাড় চলছে। জনস্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, একদিনেই ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৬৫৫ জন রোগী। সামাজিক অপরাধও বেড়েছে; কেরানীগঞ্জে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে গুলি করে ২৫-৩০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় এক নিখোঁজ কিশোরের বাবা সন্তানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬৫৫। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্ঘটনায় লরি ছিদ্র, অপরিশোধিত জেনেও তেল নিয়ে গেলেন এলাকাবাসী। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ / ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, জানি না’, নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজছেন বাবা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে ম্যার্ৎসের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন হলে এএফডি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জার্মানিতে ‘নব্য-নাৎসিদের উত্থান’ দেখে আতঙ্কিত ইউরোপ।






