আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। বরেণ্য এই শিল্পীর প্রয়াণ দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য নড়াইল জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম জানিয়েছেন, স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের যাবতীয় প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তার এই কীর্তিতে মুগ্ধ হন শ্যামাপ্রসাদসহ নড়াইলের তৎকালীন জমিদাররা।
আজকের কর্মসূচির সূচনা হয় ভোর ৬টায় কোরআন খতমের মাধ্যমে। এরপর সকাল ৯টায় শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় আয়োজিত হয় দোয়া মোনাজাত এবং সকাল ১০টায় রাখা হয় আলোচনা অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী। এস এম সুলতানের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকারি অর্থায়নে তার নিজ বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এসএম সুলতান কমপ্লেক্স।
শিল্পীর জন্ম ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়ায়। তার বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির দেয়া ডাকনাম ছিল 'লাল মিয়া'। শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া সুলতান ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রি বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। ১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এঁকে তিনি সবার দৃষ্টি কাড়েন এবং ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায়ই জমিদার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি এঁকে তাক লাগিয়ে দেন। তিনি তাদের জীবন-জীবিকা ভিত্তিক ছবি আঁকেন।
১৯৩৮ সালে কলকাতায় পাড়ি জমানোর পর চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন তিনি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে তার ভর্তির সুযোগ হয়। ১৯৪৩ বা ১৯৪৪ সালের দিকে তিনি আর্ট স্কুল ছেড়ে দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। কাশ্মিরের পাহাড়ি উপজাতিদের জীবনের বাস্তব চিত্র তার তুলিতে ফুটে উঠেছিল সেই সময়। ১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের লাহোরে প্রদর্শনীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন। সে সময় পাবলো পিকাসো, সালভেদর দালি ও পল ক্লির মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের পাশাপাশি তার শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছিল। ১৯৪৩ মতান্তরে ১৯৪৪ সালে কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করে ঘুরে বেড়ান এখানে-সেখানে। কিছুদিন কাশ্মিরের পাহাড়ে উপ-জাতিদের সঙ্গে বসবাস করেন।
১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে এসে এস এম সুলতান শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন শিক্ষার জন্য ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই ‘দ্য ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৭ সালে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ‘শিশুস্বর্গ’ স্থাপিত হয়। শিল্পচর্চার পাশাপাশি বাঁশি ও সুরযন্ত্র বাজাতে দক্ষ ছিলেন তিনি। তার সাহচর্য ও ভালোবাসায় ছিল বিষধর সাপ, ভল্লুক, বানরসহ নানা পশু-পাখি। অবশ্য অনেক আগেই স্বপ্নের শিশুস্বর্গ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি।
কর্মজীবনে তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে রেসিডেন্ট আর্টিস্ট, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এ ছাড়া ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ম্যান অব দ্য ইয়ার', নিউ ইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে 'ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট' এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে 'ম্যান অব এশিয়া' উপাধি পান। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই কিংবদন্তি শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। নড়াইল শহরের চিত্রা নদীর পাড়ে নিজ বাড়ির আঙিনাতেই তাকে সমাহিত করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০