সিরাজগঞ্জের চলনবিলে বর্তমানে পরিযায়ী ও দেশীয় পাখিদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিলের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত ও জলাশয় ঘিরে শিকারিরা লতাপাতা দিয়ে তৈরি করছেন অভিনব সব ফাঁদ। একটি পাখিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে অন্য পাখিদের আকৃষ্ট করে ধরা হচ্ছে একের পর এক পাখি। পরে এসব পাখি স্থানীয় হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে আটকে পড়া পাখি ধরে খাঁচায় রাখা হয় এবং সুযোগ বুঝে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে পাখি শিকার চললেও প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। গত ৪ অক্টোবর রবিবার সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়ি পাড়া মৌজার ধানক্ষেতে এমনই এক চিত্র দেখা যায়। সেখানে নয়ন হোসেন ও সাগর নামের কয়েকজন শিকারিকে বড় লতাপাতার ফাঁদ ও কলাপাতা দিয়ে তৈরি খাঁচাসহ পাখি শিকার করতে দেখা যায়। অনেক সময় শিকার করা পাখির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার মতো অমানবিক কৌশলও প্রয়োগ করেন তারা। তাদের মধ্যে নয়ন হোসেন ও সাগরের হাতে ছিল বড় পাতা দিয়ে তৈরি দুটি ফাঁদ। ওই ক্রেতার দাবি, তার মতো আরো দুজন পাখি কিনে বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
পাখি শিকারিরা লতাপাতার ঝোপের ভেতর জালের ফাঁদ তৈরি করেন। একটি পাখির পা চিকন সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের কঞ্চির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হয়। বাঁধা পাখির ডানা ঝাপটানো ও ডাক শুনে অন্য পাখিরা কাছে এলে জালে আটকা পড়ে। মোতালেব সেখ নামের আরেক শিকারি জানান, গত তিন-চার বছর ধরে তিনি শখের বশেই এলাকায় ঘুরে পাখি শিকার করছেন এবং কখনো বাধার মুখে পড়েননি। আরেক শিকারি জানান, প্রতিদিন এভাবে ছয়-সাতটি পাখি ধরে তিনি অনায়াসেই দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। বাঁধা পাখিটি ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটালে আশপাশের অন্য পাখিরা সেটির কাছে এসে বসার চেষ্টা করে। কখনো বাধার সম্মুখীন হননি বলেও দাবি তার।
পাখি ক্রেতাদের ভাষ্য, শিকারিরা অনেক সময় রাস্তার তল্লাশিতে ধরা পড়ার ভয়ে জবাই করে পরিষ্কার করে ব্যাগে ভরে পাখি সরবরাহ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্রেতা জানান, তিনি দেশীয় বক ও অতিথি পাখিসহ কয়েকটি পাখি ২ হাজার টাকায় কিনেছেন। শীতের আগমনে চলনবিলে বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সমাগম ঘটলেও শিকারিদের দৌরাত্ম্যে তাদের নিরাপদ বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। শিকারিদের ব্যবহৃত পদ্ধতিটিও বেশ অভিনব। রাস্তায় তল্লাশি হলে ঝামেলা হতে পারে এমন আশঙ্কায় পাখিগুলো জবাই করে পরিষ্কার করে ব্যাগে তুলে দেওয়া হয়।
‘দি বার্ডস সেফটি হাউজ’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস জানান, স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করলেও তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় পাখি নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, ২০২০ সাল থেকে তাদের কমিটি পাখি রক্ষায় কাজ করছে এবং গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছে। তবে শিকারিরা আইন মানতে না চাওয়ায় পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পাখি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, খাদ্যের সন্ধানে ও নিরাপত্তার জন্য পাখিরা এখানে আসে, তাই তাদের রক্ষা করা জরুরি। পাখি নিধন দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
তাড়াশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করছেন। একই অভিমত ব্যক্ত করেন রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নিয়ামুর রহমান। তিনি জানান, জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু প্রচার-প্রচারণা যথেষ্ট নয়। চলনবিলের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে শিকারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, বিক্রয়কেন্দ্রে কড়া নজরদারি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই জলাভূমি ও সবুজ প্রান্তর পরিযায়ী পাখিদের জন্য অভয়ারণ্যের বদলে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।





