
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পরবর্তী দুই বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ মূলত আসন্ন মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। এই নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, বরং ট্রাম্পের প্রভাব কতটা অটুট থাকবে তাও স্পষ্ট করবে। দেশজুড়ে হাজার হাজার পদে ভোট হলেও মূল লড়াই হচ্ছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা দখল নিয়ে, যেখানে বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির আধিপত্য থাকলেও তা এবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আগামী মঙ্গলবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। বর্তমানে দলটির ২১৮ জন প্রতিনিধি রয়েছেন। সিনেট সদস্যরা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
জনমত জরিপ, ভোটারদের অগ্রাধিকার এবং নির্বাচনী প্রচারের ব্যয় বিশ্লেষণ করে ডেমোক্র্যাটদের সামনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখছেন বিশ্লেষকরা। অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় কোনো একটি দলের সমর্থন এতটাই শক্তিশালী যে সেখানে ফলাফল অনেকটাই অনুমান করা যায়।
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো তাঁর জনসমর্থনের ক্রমাবনতি।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তাঁর সমর্থন ৫০ শতাংশের কিছু বেশি থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ বিমান হামলার সিদ্ধান্তের সময় সমর্থন ছিল ৪২ শতাংশ, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, প্রথম মেয়াদের একই পর্যায়ে ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল ৪৩ শতাংশ। তুলনায় জো বাইডেনের শাসনামলে একই সময়ে তাঁর সমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ। উভয় প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছিল, যদিও তারা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এবার ট্রাম্পের সমর্থন বাইডেনের চেয়েও কম হওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে, এমনকি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি রাজ্যেও তারা জয়ের স্বপ্ন দেখছে। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানও ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করে তুলছে। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের সংখ্যা কমিয়ে আনাকে নিজেদের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অতীতেও জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই এবার ভোট হচ্ছে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে ২১৮টি আসন রয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত নাজুক। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে ১৮টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৩৪ সাল থেকে অধিকাংশ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি ইতিবাচক পরিসংখ্যান। দলটির অনুকূলে রয়েছে, এমন আসনগুলোর মধ্যে ৩৬টিতে জয় নিশ্চিত করতে পারলেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে।
অন্যদিকে, সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা সুবিধাজনক। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে তাদের ৫৩টি আসন রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনের মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে ফলাফল অনিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সাতটির মধ্যে ছয়টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে এই সাতটি আসনের মধ্যে অন্তত চারটিতে জয়লাভের পাশাপাশি নিজেদের অনুকূলে থাকা আরও চারটি আসন ধরে রাখতে হবে, যা বেশ চ্যালেঞ্জিং। পাশাপাশি একজন স্বতন্ত্র সদস্যও সাধারণত রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দেন।
বিশেষ করে মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের সাথে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা মাইক রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া আলাস্কা, আইওয়া এবং ওহাইওর মতো রিপাবলিকান প্রধান এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয় পাওয়া প্রয়োজন। টেক্সাসের মতো রাজ্যেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, যা ১৯৮৮ সালের পর সেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রথম জয়ের আশা তৈরি করেছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন—এমন আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো রাজ্যেও সিনেটের আসন জিততে হবে ডেমোক্র্যাটদের। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রা সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ব্যয়ভারেও চাপ তৈরি করেছে। তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আইনের কারণে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ কতটা সংকুচিত হচ্ছে, সে বিষয়গুলো সামনে আনছেন। এর ফলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং নির্বাচনে সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হবে। আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হবে তাঁকে।
ভোটারদের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ট্রাম্প গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালন ২ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে নামানোর দাবি করেছিলেন, কিন্তু ইরানের সাথে উত্তেজনার ফলে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দাম চার ডলারে পৌঁছেছে। আগস্টের এক জরিপ অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। কিন্তু এর মাত্র চার দিন পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
তবে নির্বাচনী তহবিলের দিক থেকে রিপাবলিকানরা বেশ এগিয়ে আছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি তথ্য অনুযায়ী, রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের কাছে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার নগদ তহবিল রয়েছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ২৩০ মিলিয়ন ডলারের কম। এর বাইরে ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মাগা ইনকরপোরেটেডের কাছে আরও ১৬০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ জমা আছে। ট্রাম্প দল আশা করছে, শেষ মুহূর্তের বিশাল তহবিল ও প্রচারণা ভোটারদের উপস্থিতি বাড়িয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করবে। এবারও নির্বাচনী তহবিল, প্রচারের ব্যাপকতা এবং নিজেদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করার আশা করছে রিপাবলিকানরা।
নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে নতুন সমীকরণ শুরু হবে। ডেমোক্র্যাটদের ইতিবাচক আভাস থাকলেও ভোটের মাঠে চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০