
সংবাদ সম্মেলনে অনেকবারই উপস্থিত থেকেছি, কিন্তু উসাইন বোল্টের মতো এমন প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা আর হয়নি। পাঁজরে কনুইয়ের গুঁতো, অন্যের পায়ের ওপর পা পড়া কিংবা ধাক্কাধাক্কির মধ্যেই নোট নিতে হয়েছে। তবে সেই অস্বস্তি মুহূর্তেই উবে যেত যখন বোল্ট তাঁর স্বভাবসুলভ রসবোধ আর কৌতুকে পুরো ঘর মাতিয়ে তুলতেন। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের সেই জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের কথা মনে পড়লে আজও শিহরণ জাগে।
বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামে সেদিন যা ঘটেছিল, তা ছিল অভাবনীয়। সাধারণত ১০০ মিটার স্প্রিন্টে কে জিতল তা বোঝার জন্য ফটোফিনিশ ক্যামেরার ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু বোল্ট ছিলেন ব্যতিক্রম। ফিনিশিং লাইনের প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতেই তিনি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন এবং ১০ মিটার দূরে থাকতেই বুক চাপড়ে নিজের জয় ঘোষণা করেছিলেন। ৯.৬৯ সেকেন্ডের সেই টাইমিং এবং তাঁর উদ্যাপন ছিল এক মায়াবী বিভ্রমের মতো, যা স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৯০ হাজার দর্শককে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
এথেন্স অলিম্পিকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি এবার ইচ্ছা করেই একদম নিচে দুই সারির চেয়ারে বসেছিলাম। এথেন্সের ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাময়, যেখানে ৯.৮৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেও শন ক্রফোর্ড কোনো পদক পাননি। কিন্তু বেইজিংয়ে বোল্ট একাই পুরো আসরকে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন। অ্যাথলেটিকসের মহাকাশে সেদিন যে নক্ষত্রের উদয় হয়েছিল, তা আজও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর।
পেশাগত জীবনে আমি চারটি অলিম্পিক কাভার করেছি—বেইজিং, লন্ডন, রিও এবং প্যারিস। বোল্টের প্রতিটি কীর্তি আমি সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। ডেনিস কম্পটনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক: ডন ব্র্যাডম্যান যেমন ক্রিকেটে একবারই এসেছেন, বোল্টও অ্যাথলেটিকসে তেমনি একমেবাদ্বিতীয়। তাঁকে ‘স্প্রিন্টার অ্যাপিয়ারিং নট জাস্ট ওয়ান্স ইন আ লাইফটাইম, বাট ওয়ান্স ইন দ্য লাইফ অব আ গেম’ হিসেবে অভিহিত করা মোটেও অত্যুক্তি নয়।
বোল্টের অর্জনের তালিকাটি দীর্ঘ। অলিম্পিকে কোনো পুরুষ স্প্রিন্টার তাঁর আগে দুবার ‘স্প্রিন্ট ডাবল’ জিততে পারেননি, বোল্ট জিতেছেন তিনবার। ১০০ ও ২০০ মিটার এবং রিলের ‘ট্রিপল’ জয়ের কীর্তিও তাঁর আগে কারও ছিল না, যা তিনি তিনবার করে ‘ট্রিপল ট্রিপল’-এর অনন্য নজির গড়েছেন। এছাড়া অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে ছয়বার স্প্রিন্ট ডাবল জয়ের রেকর্ডও তাঁর দখলে।
অবশ্য সতীর্থ নেস্টা কার্টারের ডোপিংয়ের কারণে বোল্টের একটি ‘ট্রিপল’ হাতছাড়া হওয়া ছিল অ্যাথলেটিকস বিশ্বের জন্য এক গভীর দুঃখের বিষয়। ডোপিংয়ের অন্ধকার জগতে বোল্ট আজীবন সত্য ও সুন্দরের প্রতীক হয়ে জ্বলেছেন। ডেক্যাথলনে দুবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ড্যালি টমসন যথার্থই বলেছিলেন, বোল্ট না থাকলে অ্যাথলেটিকস খেলাটি হয়তো অনেক আগেই তলিয়ে যেত।
বোল্টের মাহাত্ম্য কেবল ট্র্যাকে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর আমুদে চরিত্র, দর্শকদের খেলার অংশ করে নেওয়া এবং সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ছেলেমানুষি খুনসুটি সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক অনন্য প্যাকেজ। মোহাম্মদ আলীর মতো তিনিও নিজেকে ‘গ্রেটেস্ট’ বা ‘কিংবদন্তি’ বলে ঘোষণা করেছেন, কিন্তু সেটি কখনোই ঔদ্ধত্য মনে হয়নি। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে ছিল অসামান্য কাজের স্বীকৃতি।
লন্ডন অলিম্পিকের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘স্প্রিন্ট ডাবল জিতলে আমি হব কিংবদন্তি।’ রিওতে এসে বলেছিলেন, ‘এবারও ট্রিপল জিতলে আমি হব অমর।’ ২০১৭ সালে লন্ডনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজেকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অলটাইম’ হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন।
বোল্টকে নিয়ে সাংবাদিকদের কখনোই বিশেষণ খুঁজতে হয়নি, তিনি নিজেই তা সরবরাহ করে গেছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু থেকে পিউমা ছিল তাঁর স্পনসর। ট্র্যাকের বোল্ট আর সংবাদ সম্মেলনের বোল্ট মিলে যে কোলাজ তৈরি করেন, তা অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলতে হয়, এমন অ্যাথলেট ভবিষ্যতে আর আসবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনি কেবল রেকর্ড ভাঙার জন্য দৌড়াননি, তিনি দৌড়কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর প্রতিটি দৌড় ছিল এক একটি উৎসব, যা বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষকে আনন্দ দিয়েছে।
বোল্ট মানেই সোনালি সূর্যকিরণ, বোল্ট মানেই অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতিশব্দ। তাঁর এই মহিমা অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংবাদ সম্মেলন যিনি করছেন, তিনি যে প্রায় কথায় কথায় কৌতুকে মাতিয়ে তুলছেন সবাইকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পেছনের খালি জায়গাটায় আমরা ৪০ থেকে ৫০ জন সাংবাদিক মানবজটলা হয়ে দাঁড়িয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন’ বলে একটা কথা সংবাদমাধ্যমে খুব প্রচলিত, যেটি শুনলেই আমার ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের ওই রাতের কথা মনে পড়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একটু আগে বার্ডস নেস্টে যা হয়েছে, তেমন কিছু দেখার অভিজ্ঞতা তো কারোরই হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেশির ভাগ ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষ হওয়ার পর যেখানে কে জিতল, তাৎক্ষণিকভাবে তা বোঝার উপায় থাকে না, সেটিতেই কিনা একজন প্রায় ২০ মিটার বাকি থাকতে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারপরও ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড জানিয়ে দিচ্ছে, এইমাত্র একটা বিশ্ব রেকর্ড হয়ে গেল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই জীবনে যত খেলা দেখেছি, বেইজিংয়ে বোল্টের ১০০ মিটারের চেয়ে অভাবনীয়, অচিন্তনীয়, অত্যাশ্চর্য কিছু আর দেখিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেকোনো খেলার গ্রেটরাই কখনো কখনো এমন মুহূর্তের জন্ম দেন, যখন অবিশ্বাসে চোখ কচলে বলতে হয়, যা দেখলাম, তা কি সত্যি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০